বলা হয়ে থাকে, বাংলা ব্যান্ড মিউজিকের ট্রেডমার্ক নেমেসিস। কঠিন বাস্তবতার অসীম স্রোতের বিপরীতে হেঁটে তারা পার করেছে দুই যুগেরও অধিক সময়। তারুণ্যকে দিয়েছে ‘কবে’, ‘বীর’, ‘ঘুড়ি’ আর ‘নির্বাসন’—এর মতো শিহরণ জাগানো অনেক গান। সুদীর্ঘ সময়ের এই চলমান যাত্রাপথে যিনি পুরোটা সময় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন, তিনি ভোকাল জোহাদ রেজা চৌধুরী। তার কাছ থেকে নেমেসিসের গল্প শুনেছেন আরফান হোসাইন রাফি
কেমন আছেন?
ভালো আছি, গত বছর দেশের পরিস্থিতির কারণে কিছুটা মন্দ গেছে, শোয়ের সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছিল; তবে খারাপ বলা যায় না—সবকিছু মিলিয়ে আমরা ভালোই আছি।
কিছুদিন আগেই ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, মনে কি পড়ে কোনো এক থার্টি ফার্স্ট নাইটে নেমেসিসের হয়ে আপনার প্রথম পারফর্মের কথা?
হা হা! এটা তো অনেক আগের কথা, প্রায় পঁচিশ থেকে ছাব্বিশ বছর আগের। ওটা নিয়ে ওভাবে চিন্তা করিনি কখনো। তবে যখনই ভাবি, ভালোই লাগে। প্রতি থার্টি ফার্স্ট নাইটে ফ্যামেলি, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া, সময় কাটানো—এটাই।
নেমেসিসের পথচলা দুই যুগের অধিক সময়ের। এত বছর ধরে ব্যান্ডকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং প্রাপ্তি কী?
অনেক রকম চ্যালেঞ্জই তো ছিল, তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আমাদের ব্যান্ডের সদস্যদের নানা কারণে একে একে ব্যান্ড ছেড়ে চলে যাওয়া। কিন্তু আমি কখনো চাই না যে নেমেসিস বন্ধ হয়ে যাক বা অন্য কিছু হোক। এ ছাড়া নানা সময়ে পলিটিক্যাল ইস্যুও ব্যান্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। খেয়াল করে দেখবেন, দেশের পরিস্থিতি যখন খারাপ থাকে, তখন মানুষ গান কম শোনে। আমরা তো মিউজিশিয়ান, শো না হলে আমরা একটু সাফার করি। আর প্রাপ্তি বলতে আমরা গান বানাচ্ছি, মানুষ শুনছে, ভালোবাসা পাচ্ছি—সব মিলিয়ে এটাই জার্নির প্রাপ্তি কিংবা আনন্দ।
প্রথম অ্যালবাম ‘অন্বেষণ’ থেকে শুরু করে চতুর্থ অ্যালবাম ‘ভিআইপি’র সংগীত যাত্রায় নেমেসিসের পরিবর্তনটা কোথায়?
এটা শ্রোতারা ভালো বলতে পারবে—প্রথম অ্যালবাম কেমন ছিল আর এখন কেমন হচ্ছে। আমি সেরকম পরিবর্তন দেখি না, তবে আমাদের ব্যান্ড মেম্বারদের পরিবর্তনটাই লক্ষণীয়। মাহের, যে ব্যান্ডের শুরুতে, মানে আমাদের ফাউন্ডিং মেম্বার ছিল, সে-ই তো দ্বিতীয় অ্যালবামের পর ব্যান্ড ছেড়ে চলে যায়। এ ছাড়া ইয়ার, নন্দিত ওরাও ছিল ফাউন্ডিং মেম্বার। প্রথম অ্যালবামের পর তারা যে যার পড়াশোনার কাজে চলে যায়, মানে ব্যান্ডে নেই তারা। তারপর তো ওমাইর... মাঝখানে আরও গিটারিস্ট আসছে। আবার ২০১৮ সালে আমাদের ড্রামার ডিও’র হার্ড অ্যাটাক—স্ট্রোক হওয়ার পর সে আর বাজাতে পারে না। সো অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ, অনেক ধরনের পরিবর্তন আসছে, কিন্তু নেমেসিস তো নেমেসিসের জায়গায় আছে। চালিয়ে যাচ্ছি আরকি, মানে অত চিন্তা করি না এগুলো নিয়ে। আমার চিন্তা সামনের দিকে—আমরা আরও গান করতে চাই।
গত বছর ‘ভিআইপি’র গানগুলো অডিও আকারে প্রকাশ পেয়েছে, শ্রোতাদের কেমন সাড়া ছিল?
অনেস্টলি বলতে, আমাদের ‘ভিআইপি’ অ্যালবামটা নিয়ে আমরা ওইভাবে প্রমোশনে যেতে পারিনি। হয়তোবা এটা আমাদের নিজেদের কারণেই ওভাবে প্রমোট করিনি, তাই অনেকেই এই অ্যালবামটা শোনেনি।
সবগুলো গান ভিডিও আকারে কবে প্রকাশ পেতে পারে?
ভিডিও আকারে আমাদের ‘ঘোর’ এবং ‘ভাঙা আয়না’—এই দুইটা অ্যাকচুয়াল মিউজিক ভিডিও বের হয়েছে। ‘তোমার চেহারা’ একটা ভিজ্যুয়াল বের হয়েছে, যদিও আমরা ওটাকে ভিডিও হিসেবে ধরি না। আমাদের প্ল্যান আরও দুই-তিনটা ভিডিও করার ইচ্ছা তো আছে, এটা হতে পারে চলতি বছরেই।
এই অ্যালবামের গানে আলাদা অনুভূতি ও ভিন্ন ধরনের ভাবনা রয়েছে, কিন্তু অ্যালবামের মূল বার্তাটা কী ছিল?
আমাদের যেই ভিআইপি কালচার কিংবা ভিআইপি মুভমেন্ট— এটা নিয়ে তো অনেকেই বিরক্ত হয়, আমরাও হই। ওইটাই আরকি। একটু মজা করছিলাম ভিআইপিদের ব্যাপারে। অনেকেই মজা পাইছে, অনেকেই বলছে যে লিরিক্সের সঙ্গে নিজেদের রিলেট করতে পারে। আবার অনেকেই নিতে পারে না, হয় না যে, এটা কী ধরনের গান—মানে বোঝে না। সবকিছু তো আর সবার জন্য নয়। তবে আমরা যারা আমাদের এসব পার্টটা পাবলিক করি, এটা থেকে নেগেটিভ-পজিটিভ সবই আসবে, এটাই আশা করি। সবাইকে তো আর আমরা সব সময় খুশি রাখতে পারব না।
ব্যক্তিগত জীবনে আপনার স্ত্রীর ক্যানসারমুক্ত হওয়ার খবর আমাদের জন্যও স্বস্তির। এই কঠিন সময়টা নেমেসিস পরিবার ও সংগীতচর্চাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?
এ সময়টায় সব ব্যান্ড মেম্বার, আশপাশের যারা আছে এবং পরিবার— সবাই খুব সাপোর্টিভ ছিল। আর সংগীতচর্চা যতটুকু সম্ভব করেছি। সে সময়ে কোনো শো আসলে হয়তো বা আমরা একটু প্র্যাকটিস করে, শো করে ফেলতাম কোনোভাবে। চ্যালেঞ্জ ছিল, তবে আমরা ম্যানেজ করেছি। তাদের (ব্যান্ড মেম্বারদের) সাপোর্টের কারণেই আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনটাও সামলাতে পেরেছি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন