ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে নব্বইয়ের দশকটি ছিল মেলোডি বা সুমধুর গানের এক সোনালী অধ্যায়। আর সেই সময়ে বলিউডকে একের পর এক ব্লকবাস্টার গান উপহার দিয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে রাজত্ব করেছিলেন দুই ভাইÍ আনন্দ শ্রীবাস্তব এবং মিলিন্দ শ্রীবাস্তব, যারা চলচ্চিত্র দুনিয়ায় ‘আনন্দ-মিলিন্দ’ নামে একচেটিয়া পরিচিত। প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক চিত্রগুপ্তের এই দুই যোগ্য সন্তান বাবার উত্তরাধিকারকে শুধু বজায় রাখেননি, বরং নিজেদের প্রতিভায় সেটিকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।
সংগ্রামের দিন পেরিয়ে রাজকীয় উত্থান
১৯৮৪ সালে ‘আব আয়েগা মজা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বলিউডে পা রাখলেও তাদের শুরুর পথটা সহজ ছিল না। তবে ১৯৮৮ সালে মুক্তি পাওয়া আমির খান ও জুহি চাওলা অভিনীত আমির-মনসুর খানের ম্যাগনাস ওপাস ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ সিনেমার হাত ধরে রাতারাতি ভাগ্যবদল হয় এই জুটির। এই সিনেমার প্রতিটি গান ভারতীয় তরুণ প্রজন্মের কাছে এক একটি অ্যান্থেম বা জাতীয় সংগীতে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে উদিত নারায়ণের কণ্ঠে ‘পাপা কহেতে হ্যায় বড়া নাম করেগা’ এবং অলকা ইয়াগনিকের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠের ‘অকেলে হ্যায় তো কেয়া গম হ্যায়’ গান দুটি ভারতীয় সংগীত ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এই অ্যালবামের বিপুল সাফল্যের পর আনন্দ-মিলিন্দ তাদের প্রথম ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লুফে নেন। নব্বই দশকের বাণিজ্যিক সিনেমার প্রাণভোমরা ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এর সাফল্যের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই সুরকার জুটিকে। নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে বলিউডের সব বড় বড় হিট সিনেমার পেছনে ছিল তাদের সুরের জাদু। মাধুরী দীক্ষিত ও অনিল কাপুরের ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘বেটা’ (১৯৯২)-এর ‘ধক ধক করতে লাগা’ কিংবা সালমান খানের ‘বাঘি’, আমির খানের ‘দিল’, গোবিন্দার ‘রাজা বাবু’, ‘কুলি নম্বর ওয়ান’ এবং ‘হিরো নম্বর ওয়ান’-এর মতো সুপারহিট সিনেমাগুলোর সুরের কারিগর ছিলেন তারাই।
গোবিন্দার নাচের তালের সঙ্গে আনন্দ-মিলিন্দের তৈরি করা চটুল অথচ সুরেলা গানগুলো আজও মানুষকে নাচতে বাধ্য করে। দীর্ঘ পথচলা ও অমর সৃষ্টিসমূহ ২০০-এরও বেশি চলচ্চিত্রে সুর দেওয়া এই গুণী জুটি গীতিকার সমীরের সাথে জুটি বেঁধে প্রায় ৯৫০টিরও বেশি গান তৈরি করার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। উদিত নারায়ণ, অলকা ইয়াগনিক, কুমার সানু, অনুরাধা পৌডওয়াল এবং কবিতা কৃষ্ণমূর্তির মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের ক্যারিয়ার গঠনেও তাদের সুরের বিশেষ অবদান ছিল।
‘লাল দুপাট্টা মলমল কা’, ‘আঞ্জাম’ এবং ‘ক্রান্তিবীর’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাদের আবহ সংগীত ও সুর আজও শ্রোতাদের নস্টালজিক করে তোলে। সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা সময়ের সাথে সাথে বলিউডের গানের ধারায় পরিবর্তন আসলেও আনন্দ-মিলিন্দের সৃষ্টি করা মেলোডির আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। সমকালীন বিভিন্ন রিয়েলিটি শো-তে যখনই এই দুই ভাই অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন, তখনই মঞ্চ জুড়ে নব্বইয়ের দশকের এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া কাজ করে।
বর্তমান যুগের রিমেক সংস্কৃতির ভিড়েও আনন্দ-মিলিন্দের সেই চিরসবুজ মৌলিক সুরগুলো আজও ভারতীয় সংগীতপ্রেমীদের মনে ভালোবাসার এক শীতল পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। মেলোডির রাজা হিসেবে তাদের নাম ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

