ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

যেখানে সাধনা আর চিতার আগুন একসঙ্গে জ্বলে

অভয়নগর (যশোর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৬, ২০২৬, ০৮:১১ এএম

যশোরের অভয়নগর উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে অবস্থিত শুড়ীরডাঙি মহাশ্মশান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক দাহস্থল হিসেবে পরিচিত। দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো এই মহাশ্মশান কেবল সৎকারের স্থান নয়, লোকধর্ম, সাধনাচর্চা ও গ্রামীণ সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হিসেবেও বিবেচিত।

বর্তমানে অভয়নগর ও মনিরামপুর উপজেলার অন্তত ১৭টি গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের শেষকৃত্য এই মহাশ্মশানেই সম্পন্ন হয়। প্রায় আড়াই একর জমির ওপর বিস্তৃত শ্মশানটির গোড়াপত্তন ব্রিটিশ শাসনামলে, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও বহু বছর আগে।

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে এলাকাটি ছিল ঘন বনাঞ্চল। সে সময় হরিশপুর গ্রামের সাধক ভেজাল সাধু এখানে একটি চালাঘর নির্মাণ করে সাধনভজন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি সিদ্ধপুরুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার মৃত্যুর পর শিষ্য কালি গোসাই ও যতীন গোসাই তার স্মরণে একটি সমাধি নির্মাণ করেন। সেই সমাধিকে কেন্দ্র করেই ধীরে ধীরে শ্মশান ও আশ্রমভিত্তিক স্থাপনার বিস্তার ঘটে।

ভেজাল সাধুর পর গোবিন্দপুরের নেদু গোসাই, মহানন্দ গোসাই, হাজারী গোসাই ও শক্তিপদ ম-ল গোসাই দীর্ঘদিন ধরে শ্মশানের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। বর্তমানে হাজারী গোসাই ও শক্তি গোসাই শ্মশানের সার্বিক তত্ত্বাবধান করছেন।

লোককথা অনুযায়ী, প্রায় এক শতাব্দীরও আগে এলাকাটিতে শুড়ী সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। এক ভয়াবহ মহামারিতে অধিকাংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করলে জীবিত কয়েকজন এলাকা ছেড়ে চলে যান। সেই ঘটনার স্মৃতি থেকেই এলাকাটির নামকরণ হয় শুড়ীরডাঙি। এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলসি ও চুলার ভগ্নাংশ থেকে ধারণা করা হয়, একসময় এখানে কুমার সম্প্রদায়ের বসতিও ছিল। এসব নিদর্শন প্রাচীন মানববসতির গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করছে।

বর্তমানে মহাশ্মশান চত্বরে শিব-দুর্গা, হনুমান, হরিশচন্দ্র, শিব-কালী ও রাধাগোবিন্দ মন্দির, ভেজাল সাধুর সমাধি, দুটি পাকা চিতা, বিশ্রামাগার, শৌচাগার, একটি বড় ও একটি ছোট পুকুর এবং শিবঠাকুরের আশ্রম রয়েছে। প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তির মেলা ও অম্বাবতী ব্রতসহ নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এখানে অনুষ্ঠিত হয়।

শ্মশান পরিচালনা কমিটির সভাপতি দেবব্রত ম-ল ও সাধারণ সম্পাদক বসন্তকুমার বিশ্বাস জানান, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে শ্মশানটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। সীমানাপ্রাচীর না থাকায় শ্মশান ও মন্দির এলাকার পবিত্রতা ক্ষুণœ হচ্ছে এবং সম্ভাব্য প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন ধ্বংসের ঝুঁকিতে রয়েছে।স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুড়ীরডাঙি মহাশ্মশান শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এটি একটি সম্ভাবনাময় প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনাও। দ্রুত প্রতœতাত্ত্বিক জরিপ, স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ এবং সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

দুই শতকের সাধনা ও শেষযাত্রার নীরব সাক্ষী এই ঐতিহ্যবাহী মহাশ্মশান আজ অবহেলায় জীর্ণ। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অনন্য ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যস্থল হিসেবে বিকশিত হতে পারে।