ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জেন-জির সমর্থন পেতে মরিয়া বিএনপি-জামায়াত

মোজাম্মেল হক আলম, লাকসাম
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬, ০৮:০৯ এএম

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ একাধিক প্রার্থী থাকলেও ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূল লড়াই হবে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, দলের কেন্দ্রীয় শিল্পবিষয়ক সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আবুল কালাম এবং ১১ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা শাখার সেক্রেটারি অধ্যাপক ড. ছৈয়দ একেএম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকী। ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সামিরা আজীম দোলা নির্বাচন থেকে সরে এসে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে সভা-সমাবেশে অংশ নেওয়ায় নির্বাচনি মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও উত্তাপ আরও বেড়েছে।

জানা যায়, কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসন দুটি উপজেলা, একটি পৌরসভা ও ১৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৩৭ হাজার ২৯৬ জন, মহিলা ভোটার দুই লাখ ৩০ হাজার ৭৫ জন, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার একজন, পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত পুরুষ ভোটার ১০ হাজার ৪৬৯ জন, মহিলা ভোটার ৬৯৪ জনসহ মোট ভোটার চার লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৫ জন। দুই উপজেলায় ১৩৪টি কেন্দ্রে ৯৬৪টি কক্ষে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

কুমিল্লার গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে এবার মোট আট প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াইয়ে ভোটের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন চার প্রার্থী। তারা হলেন- ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মো. আবুল কালাম, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ড. ছৈয়দ একেএম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকী, চেয়ার প্রতীকের প্রার্থী মীর মো. আবু বকর সিদ্দিক ও হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী সেলিম মাহমুদ। এ ছাড়াও এ নির্বাচনে আরও তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও প্রার্থীর উপস্থিতি এবং তাদের প্রচার নেই চোখে পড়ার মতো। ওই তিন প্রার্থী হলেনÑ জাতীয় পার্টি প্রার্থী প্রফেসর ড. মো. গোলাম মোস্তফা কামাল (লাঙ্গল), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী (ছড়ি) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আবুল কাসেম (হাঁস)।

মাঠপর্যায়ের জরিপ, তরুণ ভোটারদের সমর্থন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বিএনপি প্রার্থী মো. আবুল কালাম জয়ের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হওয়ায় তিনি বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত কর্নেল (অব.) এম. আনোয়ারুল আজিমের কন্যা সামিরা আজীম দোলা স্বতন্ত্র প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে ধানের শীষে সক্রিয় হওয়ায় বিএনপির পক্ষে অনুকূল হাওয়া বইছে বলেও মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

এদিকে, ১১ দলীয় জোট প্রার্থী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ড. ছৈয়দ একেএম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকীরও শক্ত অবস্থান রয়েছে। তিনি নিয়মিত বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ ও পথসভা করে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। প্রচারে তিনিও পিছিয়ে নেই। রাজনৈতিক দলের বাইরে সমাজসেবা, জনকল্যাণে সর্বদা নিয়োজিত থাকা, বিপদে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোসহ ভিন্ন রকম জনপ্রিয়তা রয়েছে তার। এই জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে তিনি রয়েছেন ভোটের মাঠে ফুরফুরে। নির্বাচনি মাঠে জেন-জিদের সমর্থন নিয়ে বিজয়ের মালা পরতে চান তিনি। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ছাত্র-জনতা এবং নিজ জনপ্রিয়তায় জয় ছিনিয়ে আনতে চান ১১ দলীয় জোট প্রার্থী দাঁড়িপাল্লার বাহক ড. ছৈয়দ একেএম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকী।

অন্যদিকে, গণসংযোগে পিছিয়ে নেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী সেলিম মাহমুদ ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ প্রার্থী মো. আবু বকর সিদ্দিক। ইসলামিক দল হিসেবে তারাও ভোটারদের মন জয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত এ আসনের দুই উপজেলা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ প্রার্থী আবু বকর এর আগেও এ আসনে নির্বাচন করেছেন। ফলে ভোটারদের কাছে তিনি পরিচিত মুখ। সুন্নি জোটের প্রার্থী হিসেবে তারও ভোটার রয়েছে অনেক। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী সেলিম মাহমুদ চরমোনাই অনুসারীদের পছন্দের প্রার্থী। তিনিও হাতপাখা প্রতীক নিয়ে এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। এলাকায় তারও জনপ্রিয়তা রয়েছে ব্যাপক। বাকি তিন প্রার্থী নাঙ্গল, ছড়ি, হাঁস। তাদের দেখা নেই ভোটের মাঠে এবং প্রচারে। 

এদিকে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে এ সংসদীয় আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত নিজ নিজ এলাকায় প্রচার, পথসভা ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকরাও বসে নেই। দলবেঁধে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন তারা। তবে এবার কাগজের পোস্টার না থাকায় প্রার্থীরা ডিজিটাল প্রচার চালাচ্ছেন বেশি। তারা বেশি সরব হয়ে উঠেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। মাইকিংয়ের শব্দের পাশে ভেসে আসছে থিম সঙের সুর। মোবাইল ফোনে ঘুরছে প্রার্থীদের ভিডিও। ইউটিউব ও শর্ট ভিডিওতে ছড়াচ্ছে নির্বাচনি বার্তা। ডিজিটাল প্রচার পেয়েছে নতুন গতি। গান, ছন্দ, লিরিক আর কনটেন্টে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ব্যস্ত দলগুলো। ফেসবুকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চমকপ্রদ ছন্দ, সুর আর লিরিকের থিম সং, রিলস ও গ্রাফিক পোস্টের মাধ্যমে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণে চলছে এক ধরনের উন্মত্ত প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে এ আসনে জোরেশোরে বইছে ভোটের হাওয়া।