ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

দখলে শত বছরের বেরুলা খাল

মোজাম্মেল হক আলম, লাকসাম
প্রকাশিত: মার্চ ৫, ২০২৬, ০৫:৪৮ এএম

শত বছরের প্রাচীন বেরুলা খাল এখন দখল ও ভরাটের কবলে পড়ে প্রায় বিলীন। পানি প্রবাহের পথ বন্ধ করে নির্মাণ করা হয়েছে রাস্তা ও ভবন। লাকসাম-নোয়াখালী আঞ্চলিক মাহসড়কের পূর্ব পাশে প্রায় ৮০ শতাংশ খাল ভরাট হয়ে গেছে। পার্শ্ববর্তী জমির মালিক ও প্রভাবশালীরা খালের অবশিষ্ট অংশও দখলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি লাকসাম উপজেলার ফতেপুর গ্রাম থেকে শুরু হয়ে চৌমুহনী এলাকায় গিয়ে মিলিত হয়েছে। খালটি একসময় ছিল এ অঞ্চলের প্রধান পানি নিষ্কাশন পথ। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও দখলের কারণে খালের অস্তিত্ব আজ সংকটাপন্ন। স্থানীরা জানান, কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কে চারলেন নির্মাণ কাজের জন্য খালটির অস্তিত্ব একবারেই বিলুপ্ত। সড়ক সম্প্রসারণ করতে গিয়ে খালটির বেশিরভাগ অংশ ভরাট করে ফেলে সড়ক জনপদ বিভাগ। বাকি অংশ পাশর্^বর্তী জায়গার মালিক ও কিছু অসাধু চক্র পুরো ভরাট করে দখলে নিয়েছে।

খালটি পুরোপুরি ভরাট হয়ে যাওয়ায় কুমিল্লা জেলার লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, নাঙ্গলকোট, নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি ও বেগমগঞ্জ উপজেলার তিন সহস্রাধিক একর কৃষি জমির উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে সৃষ্টি হচ্ছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা।

২০২৪ সালের বন্যায় দীর্ঘদিন পানিবন্দি ছিলেন লাকসাম ও মনোহরগঞ্জের লাখো মানুষ। তখন ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি তলিয়ে যায়। স্থানীয়দের মতে, বেরুলা খাল দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়াই এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতার মূল কারণ।

কুমিল্লা দক্ষিণাঞ্চলের জলাবদ্ধতার নেপথ্যে বেরুলা খাল অবৈধভাবে দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়াকে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। তারা বলছেন, শাখা খাল, জলাধার ও নি¤œাঞ্চল দখল ও ভরাটের কারণে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় পড়ে দিনাতিপাত করে। এখনো প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন নালাগুলোয় দখলদারিত্ব চলছে। এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের জন্য শাখা খালসহ বেরুলা খালটিকে দখলমুক্ত করে নব্য ও পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, অতীতে এ খাল দিয়ে নৌকা করে নোয়াখালী থেকে লাকসাম দৌলতগঞ্জ বাজারে মালামাল আনা-নেওয়া করা হতো। পালতোলা নৌকা করে পার হয়ে যাওয়া মাঝির কণ্ঠের সুর ভেসে আসত। খাল থেকে পানি নিতে আসা ঘোমটা দেওয়া গাঁয়ের বধূরা কান পেতে শুনতেন সে গান। খালের পানিতে মাছ শিকার করে সংসার চালাতেন স্থানীয় জেলেরা। তবে দখলে ও অপরিকল্পিত রাস্তা-ব্রিজ নির্মাণের কারণে খালের নেই কোনো অস্তিত্ব। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করা হয়েছে চারলেনের রাস্তার কাজ করতে গিয়ে। রাস্তার উন্নয়নের কাজ করতে গিয়ে খালটি ভরাট করে ফেলা হয়েছে। ফলে সামনের বছরগুলোতে ফসল ফলানো নিয়ে চিন্তিত এই এলাকার কৃষকেরা।

বেরুলা খালের সঙ্গে কুমিল্লার লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, নাঙ্গলকোট, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি ও বেগমগঞ্জের বিভিন্ন শাখা খালের সংযোগ রয়েছে। এ খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বিগত বছরের তুলনায় আরও বেশি বন্যা ও জলাবদ্ধতার কবলে পড়ার আশংকা করছেন লাকসাম পৌরসভার ফতেপুর, উত্তকুল, উপজেলার উত্তরদা, আজগরা, গোবিন্দুপুর, মনোহরগঞ্জ উপজেলার খিলা, নাথেরপেটুয়া, বিপুলাসার ও নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি ও বেগমগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দারা।

অভিযোগ উঠেছে সওজরের নামে রেকর্ডভুক্ত ও নামজারিকৃত প্রায় দেড় একর খালি জায়গা (রাস্তার পূর্বপাশে) ভরাট না করে চারলেন সড়ক সম্প্রসারণে ঐতিহ্যবাহী বহু পুরোনো চন্দনা বাজার বিলুপ্তের পাঁয়তারা করছে ওই অসাধু চক্রটি। সড়কের গতিপথ পরিবর্তন এনে স্থায়ী-অস্থায়ী প্রায় শতাধিক স্থাপনা ভেঙে দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী, কর্মচারীসহ এতে অন্তত দুই শতাধিক পরিবারের ক্ষতিসাধন করতে উঠে পড়ে লেগেছে তারা। শত বছরের পুরাতন চন্দনা বাজার অধিগ্রহণ ও বিলুপ্ত না করে মূলপরিকল্পনা ও নকশা অসুযায়ী চারলেন সড়ক সম্প্রসারণ করারও অনুরোধ জানান এখানকার দোকান মালিক বাজার ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী।

এতদাঞ্চলের বিশিষ্টজনরা বলেন, শত বছরের প্রচীন এই খালটি ১৯৭৮ সালের দিকে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে সংস্কার করা হয়। খালটি দিয়ে নোয়াখালী থেকে নৌকায় করে লাকসাম দৌলতগঞ্জ বাজারে মালামাল আনা-নেওয়া করা হতো। খালটি দখল করে ভরাটের কারণে এলাকার মানুষের বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে চাষাবাদ ব্যাহত হবে। সেচ সংকটে পড়বে ওই এলাকার কৃষিজমি। এতে এ এলাকার মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। খালের ওপর অবৈধভাবে স্থাপনা গড়ে ওঠার কারণে দেখে বোঝার উপায় নাই যে এখানে একসময় খাল ছিল। ফলে স্বাভাবিক বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় উঁচু-নিচুস্তরের সড়কগুলো। একটু ঝুম বৃষ্টি হলেই এতদাঞ্চলে নামে সীমাহীন দুর্ভোগ। তারা আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খাল খনন ঘোষণা এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে আশার প্রদীপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী শত বছরের এ খালটিকে উদ্ধার করে জলাবদ্ধতা থেকে এতদাঞ্চলের মানুষকে রক্ষা করবেন।

এ ব্যাপারে লাকসাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার নার্গিস সুলতানা বলেন, এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানার পর আপনাদের জানাতে পারবো। তবে উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) বিস্তারিত তথ্য তুলে আনতে বলা হয়েছে। এখনো পূনাঙ্গ তথ্য তৈরি হয়নি।