প্রকৃতি আর বাজারÑ দু’দিক থেকেই অনিশ্চয়তার মুখে লালমনিরহাটের কৃষকেরা। মাঠজুড়ে সোনালি ধানের হাসি থাকলেও আকাশের কালো মেঘ আর বাজারদরের পতনে হতাশা বাড়ছে তাদের মাঝে। ধান ঘরে তোলার এই মৌসুমে উৎপাদন খরচ না ওঠায় বড় ধরনের লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন চাষিরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে লালমনিরহাটে ৪৮ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১০ হেক্টর বেশি। এর বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে পাকতে শুরু করেছে। কিন্তু অনিশ্চিত আবহাওয়া সেই সোনালি স্বপ্নকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছে। কোথাও কৃষকেরা ধান কাটতে সাহস পাচ্ছেন না, আবার কোথাও কাটা ধান আচমকা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছে। পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ জমির ধান কাটার উপযুক্ত হলেও কৃষকরা অপেক্ষা করছেন আকাশ পরিষ্কার হওয়ার জন্য। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মাঝে সোনালি স্বপ্ন ঘরে তুললেও দাম নিয়ে বড় চিন্তার ভাঁজ কৃষকদের কপালে। এবারে বোরো চাষাবাদের শুরু থেকে তেল আর সার উচ্চদামে সংগ্রহ করতে হয়েছে কৃষকদের।
যে কারণে উৎপাদন খরচ বিগত দিনের চেয়ে অনেক বেশি। চলতি মৌসুমে প্রতিমণ ধানের উৎপাদন খরচ পড়ছে সাড়ে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা। বর্তমানে বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাড়েনি ধানের দাম। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। আলু আর তামাকের লোকসানের পরে বোরোতে লোকসান গুনে চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণাও দিচ্ছেন অনেক চাষি।
আদিতমারীর ভাদাই গ্রামের কৃষক সবুর ম-ল বলেন, এক ‘সপ্তাহ আগে ধান পেকে গেছে। কিন্তু এখন কেটে ফেললে যদি বৃষ্টি হয়, শুকাতে না পারলে সব নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ঝুঁকি নিতে পারছি না।
কালীগঞ্জের কাকিনা চাপারতল গ্রামের আহেদুল ইসলাম বলেন, ধানের দাম কম, আর খরচ অনেক বেশি। ধান উৎপাদনে বীজ, সার, সেচ, শ্রমিক, কাটা, বাধা, বাড়িতে আনা আর মাড়াই মিলিয়ে প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকার মতো খরচ হচ্ছে। ধান বিক্রি করলে মিলছে মাত্র ১১ হাজার টাকা। এর আগে আলু আর তামাকে লোকসান হয়েছে। এখন ধানেও লোকসান। এমন লোকসান হলে কৃষকেরা বাঁচব কেমনে?
সদর উপজেলার কালমাটি গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করে সার আর তেল বেশি দামে কিনতে হয়েছে। এখন সেই ধানেও লোকসান গুনতে হচ্ছে। সরকার দাম নির্ধারণ করেছে প্রতিমণ এক হাজার ৪শ টাকা। বাজারে এখন বিক্রি হচ্ছে মাত্র সাড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। চাষাবাদ করে কৃষকরা লোকসান গুনলেও লাভবান হচ্ছেন ফরিয়া আর মজুতদাররা। এমন হলে চাষাবাদ ছেড়ে দিতে হবে। কাকিনা চর রুদ্রেশ্বর গ্রামের কৃষক আছমত আলী বলেন, ‘এই এক বিঘা ধানই আমার সারা বছরের ভরসা। ধানে ফলন ভালো হয়েছে ঠিকই তবে দাম নেই। বাজারে গেলে ধানের দামই কেউ বলে না। উৎপাদন খরচ পড়ছে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা। বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মণ।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সাইখুল আরিফিন বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবারে বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। মাড়াই মৌসুমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ধান বাঁচাতে ৮০ শতাংশ ধান পাকলেই কর্তন করে নিতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ধান শুকানোর পরে সরকারি গুদামে বিক্রি করলে কৃষকদের লোকসান নয় লাভ হবে। কৃষকদের ধান কিনতে খাদ্য বিভাগে আমরা কৃষকদের তালিকা দিয়েছি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন