আমের রাজধানীখ্যাত রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বানেশ^র হাটে মৌসুমি আম বাণিজ্য জমে উঠেছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই দেশের অন্যতম বৃহৎ এই পাইকারি আমবাজারে কৃষক, বাগান মালিক, আড়তদার ও পাইকারদের পদচারণায় সরব হয়ে উঠছে পুরো এলাকা। তবে আমের সরবরাহ ব্যাপক হলেও পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকায় আমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগে হতাশা দেখা দিয়েছে চাষিদের মধ্যে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শতবর্ষী এই হাটে প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আম আসছে। সদর, বাঘা, চারঘাট, বাগমারা, দুর্গাপুর ও পুঠিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার বাগান মালিকরা ট্রাক, পিকআপ ও ভ্যানে করে আম নিয়ে আসছেন। ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধ আমবোঝাই যানবাহনে ব্যস্ত সময় পার করছে মৌসুমি বাণিজ্য কেন্দ্রটি।
চলতি মৌসুমে ৩০ মে থেকে রাজশাহীর জনপ্রিয় জাত ক্ষীরশাপাত বা হিমসাগর আম বাজারে আসতে শুরু করায় হাটে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। জেলার ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এর আগে ১৫ মে থেকে গুটি আম, ২২ মে থেকে গোপালভোগ এবং ২৫ মে থেকে রানীপছন্দ ও লক্ষ্মণভোগ বাজারজাত শুরু হয়। আগামী ১০ জুন থেকে ল্যাংড়া এবং ১৫ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি বাজারে আসার কথা রয়েছে।
বর্তমানে বানেশ^র হাটে জাত ও মানভেদে হিমসাগর আম প্রতি মণ এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা, গোপালভোগ এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা, লক্ষ্মণভোগ ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা এবং গুটি আম ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, গত বছরের তুলনায় কয়েকটি জনপ্রিয় জাতের আমের দাম এবার তুলনামূলক কম।
বাগান মালিকদের অভিযোগ, সারা বছর পরিচর্যা, সেচ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ বহন করার পরও বাজারে ন্যায্য মূল্য মিলছে না। অনেক কৃষকের মতে, ঈদুল আজহার ছুটির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা এখনো পুরোপুরি বাজারে ফিরতে পারেননি। ফলে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা কম থাকায় দামেও প্রভাব পড়েছে।
হাটের ব্যবসায়ীরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম আমের বাজারগুলোর অন্যতম এই বানেশ্বর হাট থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার আম দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটের বাজারে এখানকার আমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, ঈদের ছুটি শেষে পাইকারদের উপস্থিতি বাড়লে বাজারে চাহিদা ও দামÑ দুটোই বাড়বে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, রোগবালাইয়ের কম প্রাদুর্ভাব এবং বাগানের নিবিড় পরিচর্যার কারণে এবার ফলনও সন্তোষজনক হয়েছে। ফলে আমকে কেন্দ্র করে রাজশাহীর গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, বানেশ্বর হাট শুধু একটি বাজার নয়; এটি রাজশাহীর আমভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রতি মৌসুমে এই হাটকে ঘিরে হাজারো কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, আড়তদার ও ব্যবসায়ীর জীবিকা আবর্তিত হয়। তাই কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা গেলে এর সুফল শুধু আমচাষিদের নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

