সন্ধ্যা নামলেই গাছপালা ও ঝোপঝাড়ের ফাঁকে হঠাৎ জ¦লে উঠত ঝিকিমিকি আলো। ঘুটঘুটে অন্ধকারে তারার মতো মিটমিটে আলো জ¦ালিয়ে রাতের নীরবতাকে মোহনীয় করে তুলত জোনাকি। গ্রামীণ আঁধার রাতে জোনাকির আলো ছিল শৈশবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শৈশবে জোনাকির পেছনে ছুটে চলা, হাতের মুঠোয় ধরে রাখা, আবার উড়িয়ে দেওয়া কিংবা কৌতূহলবশত উল্টে-পাল্টে দেখার স্মৃতি কার না আছে!
কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম-গঞ্জে এখন আর আগের মতো দেখা মেলে না এই আলোর বাহকদের। টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দিনে দিনে নিজেদের আলো নিভিয়ে বিলুপ্তির পথে হাঁটছে এই নিশাচর পোকা।
বিজ্ঞানীদের মতে, জোনাকি মূলত বিটল শ্রেণির কালচে বাদামি রঙের পোকা, যাকে ইংরেজিতে ‘ফায়ার ফ্লাই’ বলা হয়। পৃথিবীতে প্রায় ২০ হাজার প্রজাতির জোনাকি রয়েছে। স্থলচর প্রাণীদের মধ্যে একমাত্র জোনাকিরই রয়েছে নিজস্ব আলো জ¦ালানোর ক্ষমতা। দিনের বেলায় এরা পুকুর, ডোবা ও নদীপাড়ের ঝোপ-জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে। ক্ষতিকারক কেঁচো ও শামুকের ডিম খেয়ে এরা ফসলের উপকার করে, আর পূর্ণবয়স্ক জোনাকিরা বেঁচে থাকে ফুলের মধু ও রস খেয়ে।
কিন্তু আজ গ্রামবাংলায় জোনাকির সেই চিরচেনা আলো হারিয়ে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ মানুষের তৈরি কৃত্রিম আলো এবং প্রকৃতির ওপর নির্মম অত্যাচার। আধুনিক যুগে প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছে গেছে ইলেকট্রিসিটি। তীব্র কৃত্রিম আলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না জোনাকিরা, কারণ এরা তীব্র আলো সহ্য করতে পারে না। মানুষের ঘনবসতিতে উজাড় হচ্ছে ঝোপঝাড় ও বাঁশবাগান, যা ছিল জোনাকিদের প্রধান আবাসস্থল। ফসলি জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের কারণেও ধ্বংস হচ্ছে এই উপকারী পোকা।
ধনবাড়ী উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. জহিরুল ইসলাম মিলন জানান, আমাদের সময়টাতে শৈশবে জোনাকি নিয়ে খেলেনি এমন গ্রামীণ মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। প্রকৃতিতে মানুষের অত্যাচার বাড়ায় জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। প্রকৃতির এই আলোর জাদুকরদের বাঁচাতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এখনই পরিকল্পিত বনায়ন ও বন্য ঝোপঝাড় রক্ষা করা জরুরি। অন্যথায়, আগামী প্রজন্ম জোনাকি পোকাকে শুধু রূপকথার গল্পেই খুঁজে পাবে।

