চট্টগ্রামের পটিয়া পৌর সদরের ব্যস্ততম শহিদ ছবুর সড়কে অবস্থিত প্রায় ৭০ বছরের পুরোনো ‘ছবুর মার্কেট’ এখন যেন এক জীবন্ত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন আগে ভবনটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও এখানে এখনো চলছে দেদার ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস। ফলে যেকোনো সময় পুরো ভবনটি ধসে বড় ধরনের প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও সাধারণ পথচারীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী মরহুম মো. আবদুছ ছবুর ১৯৬০ সালে নিজস্ব বসতঘর ও আয়ের উৎস হিসেবে এই ভবন নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে নিচতলায় দোকানঘর সংযুক্ত করলে এটি এলাকায় ‘ছবুর মার্কেট’ নামে পরিচিতি পায়। অভিযোগ রয়েছে, পটিয়া পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পরও ভবনটির কোনো অনুমোদিত নকশা বা বৈধ নির্মাণ অনুমতি নেওয়া হয়নি। বর্তমানে এই দ্বিতল ও আংশিক ত্রিতল ভবনের ওপরের অংশে মরহুম আবদুছ ছবুরের পরিবারের সদস্যরা বসবাস করছেন। একই সঙ্গে মার্কেটের অর্ধশতাধিক দোকানে দুই শতাধিক ব্যবসায়ী ও কর্মচারী প্রতিদিন জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে রুটি-রুজির সংস্থান করছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিনের পুরোনো এই ভবনের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ছাদ দিয়ে প্রতিনিয়ত পানি চুইয়ে পড়ছে, ভেতরের লোহার রডে মরিচা ধরে পলেস্তারা খসে পড়ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, সামান্য ভূমিকম্প বা ভারী যানবাহনের কম্পনেও পুরো মার্কেট কেঁপে ওঠে। ইতিমধ্যে এই মার্কেটে একাধিকবার ছাদ ধসের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৪ মে বিকেলে মার্কেটের ‘নূর টেলিকম’ নামের একটি দোকানের ছাদের অংশ ধসে পড়ে বাবলু নামে এক ব্যবসায়ী গুরুতর আহত হন। তার মাথায় আঘাত লেগে বেশ কয়েকটি সেলাই দিতে হয়। এর আগে ২০২২ সালের ১৪ জুলাই ‘এশিয়া গার্মেন্টস’ নামের আরেকটি দোকানের ছাদ ধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সৌভাগ্যবশত তখন দোকানটি বন্ধ থাকায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, পরিত্যক্ত ভবনে ব্যবসা বা ভাড়া দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ হলেও ভবনের কিছু অংশে এখনো প্রভাবশালী চক্র ভাড়া আদায় করছে, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১০ আগস্ট ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। পরে একই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর ভবনটি দ্রুত অপসারণের জন্য মালিকপক্ষকে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়। তবে রহস্যজনকভাবে চার বছর পার হলেও ভবনটি অপসারণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, আর কোনো দুর্ঘটনার অপেক্ষা না করে দ্রুত এই অবৈধ ও পরিত্যক্ত ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হোক।
এ বিষয়ে ছবুর মার্কেটের মালিকপক্ষের সদস্য মুহাম্মদ আবদুস সোবহান বলেন, ‘মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আমরা কয়েক বছর ধরে এটি ভেঙে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছি। কিন্তু বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। জনসাধারণের নিরাপত্তার স্বার্থে এই বিশাল ভবনটি অপসারণে এখন সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি আরও জানান, ২০২২ সালেই তারা স্থানীয় পত্রিকায় সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিলেন।
পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহানুর রহমান বলেন, পরিত্যক্ত ভবনটি নিজ দায়িত্বে অপসারণের জন্য মালিকপক্ষকে একাধিকবার আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তারা এটি সরাতে ব্যর্থ হলে জনস্বার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত উচ্ছেদ ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পটিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন মাস্টার রাজেশ বড়ুয়া বলেন, পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত করেছে। আমরা ভবনটি পর্যবেক্ষণ করছি এবং যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের টিম প্রস্তুত রয়েছে।

