ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে গত এক দশকে পর্যায়ক্রমে সিলেট অঞ্চলের বেশ কয়েকটি যাত্রীবাহী ও লোকাল ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সিলেট-ঢাকা, সিলেট-চট্টগ্রাম এবং সিলেট-আখাউড়া রুটের অসংখ্য সাধারণ যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব রেলওয়ে স্টেশনে বর্তমানে কোনো আন্তনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই, সেসব এলাকার মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
রেলওয়ে সূত্র ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও সিলেট-ঢাকা রুটে রাতের সুরমা মেইল, সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে জালালাবাদ এক্সপ্রেস এবং সিলেট-আখাউড়া রুটে কুশিয়ারা এক্সপ্রেস ও একটি লোকাল ট্রেন নিয়মিত চলাচল করত। এ ছাড়া সিলেট-আখাউড়া রুটে একজোড়া ডেমু ট্রেনও ছিল। এসব ট্রেন পথে প্রায় সব স্টেশনেই যাত্রাবিরতি করত। ফলে স্বল্প খরচে সাধারণ মানুষ সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের সুযোগ পেতেন।
তবে ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের অজুহাতে একের পর এক ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বহু মানুষ বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে ঢাকা-সিলেট ও সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী আন্তনগর ট্রেনগুলো অধিকাংশ ছোট স্টেশনে না থামায় স্থানীয় যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেট-ঢাকা রুটের সুরমা মেইল প্রায় ছয় মাস আগে ইঞ্জিন সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে ২০২০ সালের দিকে সিলেট-চট্টগ্রাম রুটের জালালাবাদ এক্সপ্রেসও বন্ধ করা হয়। একইভাবে সিলেট-আখাউড়া রুটের কুশিয়ারা এক্সপ্রেস এবং ২০১৯ সালে চালু হওয়া ডেমু ট্রেনও ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে যায়।
লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ছোট ছোট রেলস্টেশনগুলোতে। মৌলভীবাজার জেলার মনু, লংলা, বরমচাল, সাতগাঁও ও রশিদপুরসহ বিভিন্ন স্টেশন এখন প্রায় জনশূন্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্টেশনগুলোতে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রেলওয়ের অবকাঠামো অযতেœ পড়ে আছে এবং অনেক জায়গা অবৈধ দখলের ঝুঁকিতে পড়েছে।
কুলাউড়ার মনু স্টেশন এলাকার বাসিন্দা রমিজ মিয়া ও মাসুক আহমেদ বলেন, ‘আগে লোকাল ট্রেন নিয়মিত থামত। শত শত মানুষ এসব ট্রেনে স্বল্প খরচে যাতায়াত করতেন। ব্যবসায়ীরাও ট্রেনে করে বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করতেন। এখন ট্রেন না থাকায় সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত ভাড়া গুনে সড়কপথে চলাচল করতে হচ্ছে।’
শমশেরনগরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তমিজ মিয়া বলেন, ‘জালালাবাদ এক্সপ্রেস ও সুরমা মেইল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব পড়েছে। আগে ট্রেনে সহজে মালামাল পরিবহন করা যেত। এখন সেই সুবিধা নেই।’
রেলওয়ের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন যে, লোকাল ট্রেন চালু থাকলে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমে যেত। কুলাউড়া স্টেশন মাস্টার রোমান আহমেদ, শমশেরনগর স্টেশন মাস্টার রজত কুমার রায় এবং শায়েস্তাগঞ্জের সহকারী স্টেশন মাস্টার উত্তম কুমার দে বলেন, ইঞ্জিন সংকটের কারণে বন্ধ ট্রেনগুলো চালু করা যাচ্ছে না। তবে এসব ট্রেন পুনরায় চালু হলে সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি আন্তনগর ট্রেনের ওপর চাপও কমবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে দেশের চাহিদার তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ ইঞ্জিন রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুরোনো ইঞ্জিন মেরামত করে চালানো হচ্ছে। নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হওয়ায় সময় লাগছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘ইঞ্জিন সংকটের কারণে বন্ধ ট্রেনগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ইঞ্জিন হাতে পেলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব এ সংকট সমাধানের চেষ্টা করছি।’ সিলেট অঞ্চলের যাত্রীদের দাবি, অন্তত কয়েকটি লোকাল ট্রেন দ্রুত পুনরায় চালু করা হোক। এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের যাতায়াত সহজ হবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে থাকা ছোট স্টেশনগুলোও আবার প্রাণ ফিরে পাবে।

