ফেনীর পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের দক্ষিণ কাউতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বারবার স্থানীয় বাসিন্দা ও স্কুল কর্তৃপক্ষের বাধার মুখেও কোনো তোয়াক্কা না করে নি¤œমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা এলজিইডির বিরুদ্ধে। সর্বশেষ গত শনিবার সকালে নি¤œমানের কাজের অভিযোগে এলাকাবাসী দ্বিতীয় দফায় কাজ বন্ধ করে দেয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকালে বিদ্যালয়টির মেঝে ঢালাইয়ের কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও নি¤œমানের সামগ্রী ব্যবহারের চিত্র দেখে স্থানীয়রা কাজ বন্ধ করে দেন। খবর পেয়ে উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে এসে কাজের মান বাড়ানোর নির্দেশ দেন। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, এলজিইডি কর্মকর্তারা চলে যাওয়ার পরপরই শ্রমিকেরা আবারও নি¤œমানের বালু, দুই-তিন নম্বর ইট এবং নামমাত্র সিমেন্ট ব্যবহার করে ঢালাই শুরু করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এলাকাবাসী আবারও জড়ো হয়ে কাজ বন্ধ করে দেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মহসিন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বারবার বাধা দেওয়ার পরেও উপজেলা এলজিইডির পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। বরং তারা উল্টো অনিয়মকেই নিয়ম বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
একই গ্রামের আরিফ ও শাকিল ভূঁইয়া জানান, এর আগেও বহুবার কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কাজের মানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এভাবে কাজ করলে যেকোনো মুহূর্তে ভবন ভেঙে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কোমলমতি শিশুদের নিরাপত্তার কথা কেউ ভাবছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৪ লাখ ৪৩ হাজার ৩০৬ টাকা ব্যয়ে এই নতুন ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ পায় ‘তুলি তুশি এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা আত্মগোপনে চলে যান। ফলে দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার পর উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী শাহ আলম ভূঁইয়ার দায়িত্বে নতুন করে কাজ শুরু হয়। এরপর থেকেই অনিয়মের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
কিছুদিন আগে ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের সময় সিলেকশন বালুর পরিবর্তে ভিটি বালু ব্যবহার এবং সিমেন্ট কম দেওয়ার অভিযোগে স্কুল কর্তৃপক্ষ কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষের বাধাকে তোয়াক্কা না করে মাত্র দুই ঘণ্টা পর আবারও জোরপূর্বক ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ করেন এলজিইডির দায়িত্বপ্রাপ্তরা।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন জানান, দেয়ালে দুই-তিন নম্বর ইটের গাঁথুনি দেওয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি নিজে চোখের সামনে অনেকগুলো অনিয়ম দেখে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, কিন্তু তারা কোনো দৃশ্যমান হস্তক্ষেপ করেনি। একদিকে কাজের মান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও নি¤œমানের, অন্যদিকে কাজ ধীরগতিতে চলায় আমাদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কোমলমতি শিশুদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরশুরাম উপজেলা প্রকৌশলী মো. ওবায়দুল বাশার বলেন, ‘আমরা মাঠ পর্যায়ে অনিয়মের বিষয়টি অবগত হয়েছি। দ্রুতই ঘটনাস্থল তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ও প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সরকারি কাজের মান নিয়ে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।’
তবে এলাকাবাসীর দাবি, শুধু মুখের আশ্বাস নয়, তদন্ত সাপেক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ভেঙে নতুন করে শিডিউল অনুযায়ী সঠিক কাজ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

