রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ক্ষতিকর ব্যবহার ছাড়াই টমেটোর ফলন প্রায় তিন গুণ বাড়ানোর অভিনব এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন হাজি মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) একজন গবেষক। ‘এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া’ প্রয়োগের মাধ্যমে এই যুগান্তকারী সাফল্য পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজিজুল হক।
তার দাবি, এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করলে প্রচলিত চাষাবাদের চেয়ে ইউরিয়া ও ফসফরাস সারের ব্যবহার ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে পেস্টিসাইড (কীটনাশক) ও ফাঞ্জিসাইডের (ছত্রাকনাশক) ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়েও দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেশি ফলন পাওয়া যাবে, যা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে এবং দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
গত দেড় বছরে দিনাজপুর সদর, চিরিরবন্দর ও সেতাবগঞ্জ উপজেলার ১০টি মাঠ পর্যায়ে শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষের ওপর এই ‘ব্যাকটেরিয়াল কনসোর্টিয়া’র সফল ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে।
সরেজমিন গবেষণা মাঠে দেখা যায়, এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করা টমেটোগাছগুলো সাধারণ গাছের তুলনায় আকারে অনেক বড়, সতেজ এবং গাঢ় সবুজ। অধিক শাখা-প্রশাখার কারণে প্রতি গাছে টমেটোর ফলন সাধারণের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি এবং আকারও বেশ বড়। সম্পূর্ণ রাসায়নিকমুক্ত এই টমেটো চাষে গাছগুলোতে চার-পাঁচবার ল্যাবরেটরিতে আইসোলেটেড এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া স্প্রে করা হয়েছে।
গবেষক ড. আজিজুল হক জানান, ১০৫ শতকের একটি জমিতে গত ১০ ফেব্রুয়ারি টমেটোর চারা রোপণ করা হয়। সেখানে ব্যাকটেরিয়া ছাড়া সাধারণ চাষের জমিতে মাত্র ৪৮ দিনে কৃষককে ৪০ বার বিভিন্ন ধরনের ব্যয়বহুল পেস্টিসাইড স্প্রে করতে হয়েছে, যার খরচ ছিল প্রায় ২০ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ক্ষতিকর রাসায়নিকের বদলে ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করা চারটি প্লটে কোনো ধরনের পেস্টিসাইড বা ছত্রাকনাশক ছাড়াই গাছগুলো সম্পূর্ণ রোগবালাইমুক্ত ও সুস্থ রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রাকৃতিকভাবে বাতাস থেকে নাইট্রোজেন ধরে রাখে এবং মাটিতে থাকা ফসফরাসকে দ্রবীভূত করে সরাসরি গাছের পুষ্টি জোগায়। ফলে মাটিতে ফসফেট, অর্গানিক ম্যাটার, অর্গানিক কার্বন, পটাশিয়াম ও সালফারের পরিমাণ বহুণ বেড়ে যায়। ল্যাব টেস্টে দেখা গেছে, এই উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো জমিতে থাকা পূর্বের বিষাক্ত কীটনাশকের অবশিষ্টাংশকে বায়োডিগ্রেডেশন বা ভেঙে ফেলার মাধ্যমে এর কার্যকারিতা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয় এবং মাটির অণুজীবের ভারসাম্য চমৎকারভাবে ফিরিয়ে আনে।
চলতি মৌসুমে দিনাজপুরে গত ৫০ দিনে নিয়মিত মাঝারি ও ভারি ঝড়-বৃষ্টি হলেও এই প্রযুক্তি আবহাওয়ার প্রতিকূলতা মোকাবিলায় দারুণ সক্ষমতা দেখিয়েছে। ঝড়-বৃষ্টির প্রভাবে রাসায়নিকযুক্ত সাধারণ খেতের বহু গাছ নেতিয়ে পড়লেও ব্যাকটেরিয়াল কনসোর্টিয়া প্রয়োগ করা খেতের গাছগুলো ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত ও সতেজ।
গবেষকদের মতে, এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত টমেটো অত্যন্ত সুস্বাদু এবং লাইকোপেন, ফ্লাভোনোইড, অ্যামিনো অ্যাসিড ও মিনারেল-সমৃদ্ধ।
এদিকে টমেটোর পাশাপাশি এই জমিতে সাথি ফসল হিসেবে আখ চাষেও মিলেছে অবিশ্বাস্য সাফল্য। ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে আখের গাছগুলো সাধারণের চেয়ে প্রায় ২ দশমিক ৫ গুণ লম্বা এবং ওজনে ভারী হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তিতে এক বিঘা জমিতে যে পরিমাণ চিনি উৎপাদন সম্ভব, তা প্রচলিত ব্যবস্থায় আড়াই বিঘা জমির সমান। এটি দেশের উঁচু জমিতে আখের উৎপাদন বাড়িয়ে চিনির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
কৃষক পর্যায়ে এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন প্রধান গবেষক ড. আজিজুল হক। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ এখনো অর্গানিক কৃষির ব্যাপারে পুরোপুরি সচেতন নয়। সরকারি কাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা আপাতত একটি জেলাতেই এই ট্রায়াল সীমাবদ্ধ রেখেছি এবং সাধারণ টমেটোর সঙ্গেই এটি বাজারে বিক্রি হচ্ছে। ভোক্তারা অনেকেই জানেন না যে তারা সম্পূর্ণ অর্গানিক ও নিরাপদ টমেটো খাচ্ছেন।’
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে দ্রুত এই পরিবেশবান্ধব ব্যাকটেরিয়াল প্রযুক্তির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন মিললে তা দেশব্যাপী মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে, যা দেশের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে এবং টেকসই কৃষিতে এক বিপ্লব ঘটাবে।’

