ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

তদন্ত কমিটি গঠন

নদীর গর্জনে কাঁপছে জনপদ

রেজাউল করিম মানিক, রংপুর
প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২৬, ০৬:১২ এএম

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর রক্ষা বাঁধে ধস এবং ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁশের পাইলিং (স্পার) ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে গঠিত এ কমিটিকে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। এর আগে মঙ্গলবার রাতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভাঙন পরিস্থিতি, নির্মাণকাজের মান এবং বাঁশের পাইলিং ভেঙে যাওয়ার কারণ পর্যালোচনার জন্য এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চ পর্যায়ের টিমও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ ও স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যায়। এতে নদীর তীরে স্থাপন করা ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ের বাঁশের পাইলিং ভেঙে পড়ে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর উত্তর-পশ্চিম অংশের রক্ষা বাঁধেও ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়।

ভাঙনের ফলে রক্ষা বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার অংশ ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেখানে প্রায় ৭০ ফুট গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু এবং রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছর একই এলাকায় ভাঙন শুরু হলে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে অস্থায়ীভাবে বাঁশের পাইলিং বসানো হয়। কিন্তু ছয় মাস না যেতেই প্রথম বড় ঢলের আঘাতে সেই পাইলিং ধসে পড়ে। ফলে ভাঙনের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ্ আল হাদী বলেন, ভাঙনের শুরুতেই যদি প্রয়োজনীয় জিও ব্যাগ ফেলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না। দীর্ঘদিন ধরে বরাদ্দের কথা বলা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে বাঁশের পাইলিং নির্মাণ করা হলেও সেটি টেকেনি। ১৪ লাখ টাকার প্রকল্প প্রথম বড় পানির চাপেই ধসে পড়েছে।

এলজিইডির গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রকৌশলী শাহ মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, গত বছর ভাঙন শুরু হওয়ার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীর পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁশের পাইলিং নির্মাণ করা হয়। তবে চলতি মৌসুমে নদীর প্রবল স্রোতের কারণে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত কমিটি বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেবে।

রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ভাঙন পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভাঙনের কারণ, প্রকল্প বাস্তবায়নের মান এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সুপারিশসহ সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে আগামী বর্ষা মৌসুমে ভাঙন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এতে শুধু দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুই নয়, আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও হুমকির মুখে পড়বে।

সচেতন মহলের মতে, তিস্তা নদীর ভাঙন নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিবছরই নদীভাঙনে বিপুল পরিমাণ জমি, বসতভিটা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর মান ও কার্যকারিতা নিয়েও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।