প্রতিষ্ঠার ১১২ বছর পেরিয়ে গেলেও নাগরিক সেবার মানে এখনো তিমিরেই রয়ে গেছে ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ী পৌরসভা। কাগজে-কলমে ‘ক’ শ্রেণির আভিজাত্য থাকলেও বাস্তবে শহরজুড়ে এখন অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, উৎকট দুর্গন্ধ আর ভাঙাচোরা রাস্তার জঞ্জাল। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভাটি এখন যেন এক চরম দুর্ভোগের জনপদ। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা আর মশা-মাছির উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা; যা নিয়ে পৌরবাসীর মনে জমেছে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শহরের পানি নিষ্কাশনের জন্য যে ড্রেনেজ ব্যবস্থা রয়েছে, তা চরমভাবে অপরিকল্পিত এবং রক্ষণাবেক্ষণহীন। দীর্ঘদিন ধরে ড্রেনগুলো পরিষ্কার না করায় বর্জ্য জমে সেগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই শহরের বড় বাজার, পান্না চত্বর, বিনোদপুর, সজ্জনকান্দা ও হাসপাতাল সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়। ড্রেনের পচা ও কালো পানি উপচে সড়কে চলে আসায় পথচারীদের দুর্ভোগের সীমা থাকে না।
বিনোদপুর এলাকার বাসিন্দা জয়ন্ত দাস যন্ত্রণার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘প্রথম শ্রেণির পৌর এলাকায় বসবাস করেও আমরা সভ্য সমাজের ন্যূনতম সুবিধা পাচ্ছি না। বাড়িতে যাওয়ার রাস্তাটি এতটাই কর্দমাক্ত ও অনুন্নত যে, বাধ্য হয়ে নিজের পকেটের টাকায় বাঁশের মাচা তৈরি করে চলাফেরা করতে হচ্ছে। ছয় মাস অন্তর সেই মাচা মেরামত করতে হয়। ড্রেন থাকলেও পানি যাওয়ার কোনো পথ নেই, প্রশাসন শুধু আশ্বাসই দিয়ে যাচ্ছে।’
এদিকে পৌরসভার একটি নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশন থাকলেও যথাযথ তদারকির অভাবে শহরের যত্রতত্র ময়লা ফেলার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে পুলিশ লাইনের সামনের জায়গাটিতে প্রতিনিয়ত ময়লা-আবর্জনা ফেলছে পৌরসভা ও স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া, শহরের প্রায় প্রতিটি রাস্তার মোড়ে মোড়ে ময়লার স্তূপ থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
বড় বাজারের ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম ও নিমাই চন্দ্র সাহা জানান, ‘ড্রেনেজ ব্যবস্থা এতটাই শোচনীয় যে বৃষ্টির দিনে ক্রেতারা বাজারে ঢুকতে পারে না। মশার কামড় আর পচা পানির গন্ধে দোকানে বসে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। নিয়মিত কর পরিশোধ করেও আমরা এমন নোংরা পরিবেশে ব্যবসা করতে বাধ্য হচ্ছি।’
পৌরসভার প্রধান সড়কগুলোর পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত সদর হাসপাতাল সড়ক, ভবনীপুর ও এতিমখানা সড়ক দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বর্তমানে চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রাস্তার পিচ উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
অটোরিকশা চালক কাশেস সরদার জানান, প্রতিদিন ভাঙাচোরা রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে যানবাহনের যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে এবং প্রায়ই গর্তে পড়ে যাত্রীরা আহত হচ্ছেন। এ ছাড়া বড়পুল, নতুন বাজার ও রেলগেট এলাকায় নিয়ন্ত্রণহীন ইজিবাইকের যত্রতত্র পার্কিং শহরটিকে এক স্থবির নগরীতে পরিণত করেছে।
পৌর এলাকার নাগরিক দুর্ভোগের বিষয়ে সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল আল মামুন সম্রাট বলেন, মূল ড্রেনগুলো সংস্কার না করলে এই জলাবদ্ধতা কাটবে না। ড্রেনের আউটলেটগুলো বন্ধ থাকায় পানি সরতে পারছে না, যা নিরসনে দ্রুত বড় ধরনের কারিগরি উদ্যোগ প্রয়োজন।
পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিউল হক দায় স্বীকার করে জানান, ‘ড্রেনেজ ব্যবস্থায় কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে এটা সত্য। তবে আমাদের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। মশক নিধন ও বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রমকেও গতিশীল করার চেষ্টা চলছে।’
পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দুর্ভোগ লাঘবে সম্প্রতি বড় অংকের উন্নয়ন প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছে। পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প সড়কগুলো পুনর্নির্মাণে প্রায় ১৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের শুভ উদ্বোধন করেছেন প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। আগামী বছরের জুনের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
তাদের আশা, ১৯ কোটি টাকার এই নতুন প্রকল্পটি যেন কেবল লোক দেখানো না হয়। কাজের মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে রাজবাড়ী পৌরসভা তার হারানো মর্যাদা ফিরে পাবেÑ এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, ‘রাজবাড়ী শহরকে একটি আধুনিক ও প্রকৃত বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ১৯ কোটি টাকার কাজ শুরু হয়েছে, যা শেষ হলে চলাচলের কষ্ট অনেকাংশে দূর হবে। পর্যায়ক্রমে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করে শহরটিকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা হবে।’

