ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

জরাজীর্ণ ভবনে কোটি টাকার নিবন্ধন

মোজাম্মেল হক আলম, লাকসাম
প্রকাশিত: জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৭:২৫ এএম

কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে চরম জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবনের দেয়াল, ছাদ ও মেঝের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দেওয়ায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবু ওই ভবনেই প্রতিদিন জমি নিবন্ধন, দলিল রেজিস্ট্রি এবং সরকারি রাজস্ব আদায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারী, দলিল লেখক এবং প্রতিদিন সেবা নিতে আসা শত শত মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের বিভিন্ন স্থানের প্লাস্টার খসে পড়ে ইট ও রড বেরিয়ে এসেছে। ছাদের একাধিক স্থানে চিড় ধরেছে এবং বর্ষা মৌসুমে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে। এতে অফিসের আসবাবপত্র, কম্পিউটার, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, বালাম বই ও অন্যান্য সরকারি কাগজপত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভবনের মেঝেতেও বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। দরজা-জানালাগুলো ভাঙাচোরা এবং দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই অফিস চত্বরে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাগ্রহীতাদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে অফিসের রেকর্ড রুম। এখানে বহু বছরের সংরক্ষিত দলিল, বালাম বই এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিসংক্রান্ত সরকারি নথি রাখা আছে। ছাদ দিয়ে পানি পড়ায় এসব নথি যেকোনো সময় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব রেকর্ড একবার নষ্ট হয়ে গেলে ভবিষ্যতে ভূমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা ও মামলা-মোকদ্দমা বাড়বে, যার ভোগান্তি পোহাতে হবে সাধারণ মানুষকে।

সেবা নিতে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, প্রতিবার জমি রেজিস্ট্রি করতে এসে তাদের আতঙ্কে থাকতে হয়। কখন ছাদের প্লাস্টার কিংবা কোনো অংশ ভেঙে পড়ে, সেই ভয় সব সময় কাজ করে। তারা বলেন, ‘এই অফিস থেকে প্রতি বছর সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। কিন্তু একটি নিরাপদ ভবন নির্মাণে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো অফিসে পানি পড়ে, কোথাও দাঁড়ানোর জায়গাও থাকে না।’

অফিসে আগত নারী, প্রবীণ ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা সেবাগ্রহীতাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা। বিশুদ্ধ খাওয়ার পানিরও কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। একমাত্র শৌচাগারটি দীর্ঘদিন ধরে নোংরা ও ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। ফলে বিশেষ করে নারী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দলিল লেখকেরাও জানান, প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ভবনের অবস্থা এতটাই নাজুক যে, সামান্য ঝড়-বৃষ্টি কিংবা ভূমিকম্প হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

লাকসাম দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম খন্দকার বলেন, ‘এই সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে প্রতি বছর সরকারের কোষাগারে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব জমা হয়। অথচ ভবনটির সংস্কার কিংবা নতুন ভবন নির্মাণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। ভাঙা ছাদের নিচেই প্রতিদিন কোটি টাকার স্ট্যাম্প ও দলিল নিবন্ধনের কাজ করতে হচ্ছে। এটি শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়, সাধারণ মানুষের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।’

অফিস সূত্রে জানা গেছে, লাকসাম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাকাল সরকারি নথিতে উল্লেখ নেই। তবে স্থানীয়দের ধারণা, ব্রিটিশ শাসনামলে লাকসাম প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার পর থেকেই এখানে জমি নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে ছনের ঘরে অফিস পরিচালিত হলেও পরে দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি বর্তমানে প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পৌঁছেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণ অথবা বিকল্প নিরাপদ স্থানে অফিস স্থানান্তরের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে লাকসামের সচেতন নাগরিক, দলিল লেখক, আইনজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নতুন সাব-রেজিস্ট্রি ভবন নির্মাণ অথবা বিকল্প নিরাপদ স্থানে অফিস স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এতে যেমন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাগ্রহীতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, তেমনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিসংক্রান্ত নথিপত্রও সংরক্ষিত থাকবে।