রাজশাহী মহানগরীর দীর্ঘদিনের যানজট কমানো এবং আন্তঃজেলা বাস চলাচলকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে প্রায় দুই দশক আগে নির্মাণ করা হয়েছিল নওদাপাড়া আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল। প্রায় ৩০ কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগে টার্মিনাল ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ হলেও সেটি আজও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। যাত্রী পরিবহনের কেন্দ্র হওয়ার বদলে টার্মিনালটি মূলত বাস পার্কিং, চালকদের বিশ্রাম এবং গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সড়ক দখল করে বাস থেকে যাত্রী ওঠানামা চলছেই, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে যানজট ও জনদুর্ভোগ।
রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০০০ সালে নগরীর নওদাপাড়া এলাকায় ৭ দশমিক ৪১ একর জমির ওপর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০০৪ সালে নির্মাণ শেষ হয়। এতে ব্যয় হয় ৭ কোটি ১৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। একসঙ্গে প্রায় ৫০০ বাস রাখার সক্ষমতা রয়েছে টার্মিনালটির। একই সময়ে ভদ্রা পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয় আরও ২৩ কোটি টাকা। পরবর্তীতে সেই সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল, রাজশাহী থেকে ছেড়ে যাওয়া সব আন্তঃজেলা বাস নওদাপাড়া টার্মিনাল থেকেই যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে যাবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো অধিকাংশ বাস নগরীর তালাইমারী, ভদ্রা, বিন্দুর মোড়, গ্রেটার রোড, রেলস্টেশন এলাকা ও বিভিন্ন অস্থায়ী কাউন্টার থেকে যাত্রী সংগ্রহ করছে। এতে ব্যস্ত সড়কগুলোতে বাসের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়ে নিয়মিত যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
বাসচালকদের ভাষ্য, যাত্রীরা টার্মিনালে না আসায় বাসগুলো বাধ্য হয়ে শহরে গিয়ে যাত্রী তুলছে। তাদের মতে, নগরীর কেন্দ্র থেকে টার্মিনালটি অনেক দূরে হওয়ায় যাত্রীদের অতিরিক্ত ৫০-১০০ টাকা ভাড়া দিয়ে সেখানে যেতে হয়। অথচ অনেক নিকটবর্তী রুটের বাসভাড়াই ৫০-৬০ টাকার মধ্যে। তাই যাত্রীরা টার্মিনালে যেতে আগ্রহী হন না। বাসচালক নাঈম ইসলাম বলেন, টার্মিনালে এখন শুধু গাড়ির শিডিউল নেওয়া হয়। এরপর বাস শহরে গিয়ে যাত্রী তুলে নির্ধারিত গন্তব্যে রওনা দেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে টার্মিনালের এক চেইন মাস্টার বলেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত টার্মিনালটির উদ্দেশ্যই পূরণ হয়নি। তার অভিযোগ, টার্মিনাল এলাকায় কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সারা বছরই জলাবদ্ধতা ও সামান্য বৃষ্টিতেই চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, শিরোইল পুরাতন বাস টার্মিনাল ঘিরে এখনো দিন-রাত সড়কের বড় অংশ দখল করে বাস পার্কিং করা হচ্ছে। এতে রাস্তা সরু হয়ে যানজট আরও প্রকট হচ্ছে। স্থানীয় পথচারীরা বলছেন, বহুবার স্থানান্তরের ঘোষণা এলেও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ফুটপাত ব্যবহারেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২২ সালে নওদাপাড়া টার্মিনালে আন্তঃজেলা বাস স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বাস মালিকদের দাবি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো প্রস্তুত নয়। তাদের অভিযোগ, টিকিট কাউন্টারগুলো ছোট, টার্মিনালের ভূমি নিচু হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই কাদা জমে যায়।
বর্তমানে রাজশাহী জেলায় বিভিন্ন মালিকানায় প্রায় ৪৫০টি বাস চলাচল করছে। এসব বাসের ছাড়পত্র বাবদ প্রতিদিন বাসপ্রতি ৩০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত ফি আদায় করে আরডিএ।
জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, টার্মিনালের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য একাধিকবার আরডিএকে জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনো প্রয়োজনীয় উন্নয়ন হয়নি। তার মতে, কাউন্টারগুলো সম্প্রসারণ, ভূমি উঁচু করা এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যবস্থা নেওয়া হলে মালিক সমিতিও শিরোইল থেকে নওদাপাড়ায় টার্মিনাল স্থানান্তরে সহযোগিতা করবে।
এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল চালু হলে মহানগরীতে যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। বিষয়টি নিয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে এবং দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ চলছে। রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট জানান, বাসমালিকদের উত্থাপিত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। উন্নয়নকাজ শেষ করে দ্রুত নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

