ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আরও তীব্র, হামলা-পাল্টা হামলায় নিহত ৮

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৮:০৪ এএম
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। শুক্রবার ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, যার মধ্যে বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও একাধিক সেতু রয়েছে, সেখানে মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছে। ইরানি সূত্রের দাবি, এসব হামলায় অন্তত আটজন নিহত এবং ২০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

মার্কিন অভিযানের জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়েছে। কুয়েতের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পানি পরিশোধন স্থাপনাসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে তেহরান। ইরানের অভিযানের প্রভাব কাতার, বাহরাইন, ওমান ও সিরিয়াতেও পড়েছে।

এদিকে, সংঘাতের কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি সেখানে একটি ট্যাঙ্কারের নিয়ন্ত্রণ নেয় মার্কিন মেরিন বাহিনী এবং একই এলাকায় আরেকটি জাহাজও হামলার শিকার হয়েছে।

গত সপ্তাহে ভেঙে যায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি। এরপর থেকেই উভয় পক্ষ ধারাবাহিকভাবে একে অপরের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দুই দেশের মধ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযান এবং আরও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। এ অবস্থায় একাধিক দেশ ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী সংলাপের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।

হামলা ও পাল্টা হামলার বিস্তার

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত পাঁচটি সেতুতে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। বন্দর খামিরের একটি সেতুতে আঘাতে সাতজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া একটি রেলস্টেশন এবং পাকিস্তান সীমান্তসংলগ্ন ইরানশাহার এলাকার একটি বিমানবন্দরও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। অন্যদিকে, বন্দর আব্বাসে পৃথক হামলায় এক নারী নিহত এবং তাঁর শিশুসন্তান আহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান বাহরাইন, কাতার ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে। কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি পরিশোধন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর সেখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়।

কুয়েতের বিদ্যুৎ, পানি ও নবায়নযোগ্য শক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে। এখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে দ্রুত সেবা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

এছাড়া ইরান দাবি করেছে, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটির পাশাপাশি ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি রাডার স্টেশনেও হামলা চালানো হয়েছে। কাতারের রাজধানী দোহায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শার্পনেলের আঘাতে এক শিশু আহত হয়েছে।

অন্যদিকে, সংঘাতের ধারাবাহিকতায় সিরিয়াতেও হামলার খবর এসেছে। ইরান জানিয়েছে, তারা তানফ এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর একটি ঘাঁটি লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছে। তবে সিরিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতেই ওই ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনারা সরে গেছে। স্থানীয় সামরিক সূত্রের দাবি, হামলা ঘাঁটির আশপাশে আঘাত হানলেও এতে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

সংঘাতের প্রভাবে তেলের বাজারে চাপ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ইরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও ওই জলপথ এবং ইরানের কয়েকটি বন্দরের ওপর অবরোধ জোরদার করেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে।

এখন পর্যন্ত দুই দেশ মূলত একে অপরের অবকাঠামোকে লক্ষ্য করেই হামলা চালালেও উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় পরিসরে সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। জবাবে ইরানও জানিয়েছে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে মধ্যপ্রাচজুড়ে বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

এদিকে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। সম্প্রতি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র সফল হচ্ছে এবং এর ইতিবাচক ফল শিগগিরই মার্কিন জনগণ অনুভব করবে।