ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

হলুদ রঙে রাঙা ভুবন

আরফান হোসাইন রাফি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩, ২০২৬, ০৩:৩৯ এএম

প্রজাপতির ডানায় ডানায় যে মিঠে রোদ্দুর ভেসে বেড়ায়, তারই ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে মাঠ ফুরিয়ে যায়, বোঝা যায় না। বাতাসে সোঁদা মাটির গন্ধ, দূরে সর্ষের হলুদ ঢেউ যেন সময় একটু থামিয়ে দেয়। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতোই এখানে ঘর নেই, গন্তব্য নেই; আছে শুধু চলা, আছে শুধু অস্থির এক নীলচে মন। মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে যাওয়া এই যাত্রা কোনো ভ্রমণসূচির মধ্যে পড়ে না, পড়ে হৃদয়ের ভাঁজে।

সর্ষেখেতের পাশে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এই হলুদ আসলে রং নয়, এক ধরনের নীরব ভাষা। সে ভাষায় কথা বলে পাখিরা, কথা বলে ঘাসফুল, কথা বলে দূরের গ্রাম। এখানে মানুষ ক্ষণিকের পথিক। সে আসে, দেখে, আবার মিলিয়ে যায়। বাসা বাঁধার তাড়া নেই, শেকড় গাঁথার দাবি নেই; কেবল মুহূর্তের সৌন্দর্যকে ছুঁয়ে দেখার এক আকুলতা। এই মাঠে দাঁড়িয়ে জীবন যেন হালকা হয়ে আসে। শহরের ভারী শব্দ, হিসাবি সময়, কংক্রিটের ক্লান্তি ঝরে পড়ে পলকেই। মনে হয়, এই হলুদ প্রান্তরে হাঁটলেই জীবনের মানে নতুন করে লেখা যায়। ঠিক যেমন কবিতায় লেখা থাকে অচেনা কোনো সত্য, যা ধরা দেয় না, তবু অনুভবে রয়ে যায়। এই শীতের মৌসুমে আপনি যদি খুঁজে থাকেন এমনই গন্তব্য তাহলে চলুন বেরিয়ে পড়া যাক, কখনো কুয়াশার নরম চাদরে ঢাকা ভোরের পথে, আবার কখনো সূর্যের আলোকরশ্মিতে ¯œাত, সজ্জ্বল হলুদে রাঙা ভুবনের খোঁজে।

কেরানীগঞ্জ

ঢাকার একেবারে কাছেই কেরানীগঞ্জ, অথচ শীতকালে এখানকার পরিবেশ যেন শহর থেকে বহু দূরের কোনো গ্রাম। বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ঘেঁষা জমিতে শীত এলেই সরিষার হলুদ ফুল ফুটে ওঠে। নদীর ধারে সারি সারি খেত, মাঝখানে সরু মাটির রাস্তা আর খেতের আইল ধরে হাঁটার অভিজ্ঞতা এক অনন্য শান্তি এনে দেয়। দূরে শহরের শব্দ থাকলেও এই হলুদ প্রান্তরে দাঁড়ালে সব ব্যস্ততা হারিয়ে যায়।

যেভাবে যাবেন : ঢাকা শহর থেকে বাবুবাজার বা শ্যামবাজার হয়ে বাস, লেগুনা বা রিকশায় সহজেই কেরানীগঞ্জ পৌঁছানো যায়।

ঝিটকা, মানিকগঞ্জ

মানিকগঞ্জের ঝিটকা এলাকায় সরিষার খেতের বিস্তার আরও ব্যাপক। যমুনা নদীর কাছাকাছি হওয়ায় এখানকার আকাশ খোলা, বাতাস মুক্ত। শীতের বিকেলে নরম রোদ পড়লে পুরো এলাকা সোনালি আভায় ঝলমল করে ওঠে। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, হলুদ রঙের এক শান্ত সমুদ্র ঢেউ খেলছে। নদী, চর আর সরিষার খেত মিলিয়ে ঝিটকার দৃশ্য শীতের দিনে আলাদা মাত্রা পায়। প্রকৃতিপ্রেমী ও আলোকচিত্রশিল্পীদের জন্য এই এলাকা বিশেষ আকর্ষণীয়।

যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে বাসে মানিকগঞ্জ সদর যেতে হবে। সেখান থেকে ঝিটকা ঘাট বা ঝিটকা এলাকার দিকে লোকাল যানবাহনে সহজেই পৌঁছানো যায়।

নারায়ণগঞ্জের গ্রামাঞ্চল

নারায়ণগঞ্জ শহরের ব্যস্ততা আর শিল্পাঞ্চলের ভিড় ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলে গেলেই শীতকালে চোখে পড়ে সরিষার হলুদ জমি। ইট, কারখানা আর ধোঁয়ার ভিড়ের মধ্যেও প্রকৃতি তার নিজস্ব সৌন্দর্য ধরে রেখেছে। আড়াইহাজারসহ আশপাশের উপজেলাগুলোতে বিস্তীর্ণ সরিষার খেত শীতের দিনে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করে। এই বৈপরীত্যই এখানকার সৌন্দর্যকে আরও আলাদা করে তোলে।

যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ শহরে যেতে হবে। সেখান থেকে সিএনজি বা লোকাল যানবাহনে গ্রামাঞ্চলের দিকে গেলে সরিষার খেত দেখা যাবে।

নরসিংদী

নরসিংদীর নাগরিয়াকান্দি এলাকায় শীত এলেই বিস্তৃত মাঠজুড়ে সরিষার ফুল ফুটে ওঠে। খোলা জমি, চারপাশে গ্রাম আর জলাশয়ের ছোঁয়া মিলিয়ে এখানকার পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম। সকালে কুয়াশার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে ফুটে থাকা হলুদ ফুলগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। মাঠের আইল ধরে হাঁটলে ফুলের গন্ধ আর নরম আলো এক গভীর প্রশান্তি তৈরি করে। নাগরিয়াকান্দির পাশাপাশি নরসিংদীর অন্যান্য উপজেলাতেও শীতকালে একই দৃশ্য দেখা যায়। খাল-বিলের ধারে, ফাঁকা জমিতে ছড়িয়ে থাকা সরিষার খেত বাতাসে দুলতে থাকে। কোথাও ছোট গাছের সারি, কোথাও দূরে গ্রামের ঘরবাড়ি মিলিয়ে এক প্রাচীন গ্রাম-বাংলার ছবি আঁকে এই অঞ্চল। এ ছাড়া নরসিংদীর মাধবদী শহরের কাছাকাছিও রয়েছে সরিষার ফুলের রাজ্য। শহরের সীমা পেরোলেই পরিবেশ বদলে যেতে শুরু করে। রাস্তার দুপাশে বিস্তৃত হলুদ জমি অনেককে থামিয়ে দেয়। কেউ দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, কেউ বা ছবি তুলে মুহূর্তগুলো ধরে রাখে।

যেভাবে যাবেন :

ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে নরসিংদী সদর আসা যায়। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশায় নাগরিয়াকান্দি ও আশপাশের গ্রামগুলোতে যাওয়া সহজ। মাধবদী যেতে হলে ঢাকাগামী বাসে মাধবদী নেমে রিকশা করে শহরের একটু বাইরে গেলেই সরিষার খেত দেখা যাবে।