দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে রাজশাহীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার উন্মুক্ত করা হয়েছে। এতে স্থায়ীভাবে শহীদ মিনারের স্বপ্নপূরণ হলো রাজশাহীবাসীর।
নির্মাণকাজ শেষে উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা কেন্দ্রীয় এ শহীদ মিনারে এবার প্রথমবারের মতো ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে শহীদ মিনারটি উন্মুক্ত করে রাজশাহী জেলা পরিষদ।
শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে অমর একুশের প্রথম প্রহরে রাজশাহী বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে উন্মুক্ত করা হয়। এরপর বহু প্রতীক্ষিত এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ফলে এবারই প্রথম নগরবাসী নিজ শহরেই একুশে ফেব্রুয়ারিতে ফুল দিয়ে শহীদদের স্মরণ করেন। এর আগে রাজশাহী নগরীর ভূবনমোহন পার্ক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও রাজশাহী কলেজ শহীদ মিনারে বিচ্ছিন্নভাবে শ্রদ্ধা জানাতেন রাজশাহীবাসী।
রাজশাহী জেলা পরিষদের তথ্য মতে, নগরীর সোনাদীঘি মোড়ের পুরান সার্ভে ইনস্টিটিউটের জায়গায় পূর্ব নির্ধারিত প্রায় এক একর এলাকাজুড়ে নির্মিত হয়েছে স্থায়ী এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে জেলা পরিষদের উদ্যোগে নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে এটি তৈরি করা হয়।
এর আগে ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম আরিফ টিপু। তবে সিটি করপোরেশন ও রাজশাহী জেলা পরিষদের মধ্যে এটি নিয়ে দরকষাকষি শুরু হয়। এ সময় ঝুলে যায় নির্মাণের প্রক্রিয়া। তবে শেষ পর্যন্ত রাজশাহী জেলা পরিষদ এটির নির্মাণকাজ শেষ করে।
এদিকে এবার প্রথমবারের মত শহীদ মিনারে ফুলে দিতে পেরে উচ্ছ্বাসিত রাজশাহীবাসী।
নগরবাসী বলে, এতদিন রাজশাহী কলেজে গিয়ে সাধারণ মানুষকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হতো, এতে ভোগান্তিও পোহাতে হতো। স্থায়ীভাবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চালু হওয়ায় এই সমস্যার সমাধান হলো এবং নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানার জন্য এমন একটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে শহীদ মিনারটি উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনও সেই অনুযায়ী কার্ড বিতরণ করে। পাশপাশি জেলা তথ্য অফিস থেকে মাইকিং করে ব্যাপক প্রচার চালায়। তিনি বলেন, এটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতা না করে প্রথম প্রহরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যমে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। সবাই এখন থেকে এক জায়গায় ফুল দিতে পারবে।
দিবসের প্রথম প্রহর ১২টা ০১ মিনিটে রাজশাহী মহানগরীর সোনাদিঘীর এলাকায় অবস্থিত নতুন কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাজশাহী-২ সদর আসনের এমপি ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী-৩ পবা -মোহনপুর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রশাসক ও অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান প্রমুখ।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতিমা, নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কাওছার হাবীব, সহকারী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) এ কে এম আনোয়ার হোসেন, প্রধান সহকারী এস এম আল মতিন, সার্ভেয়ার ও উপসহকারী প্রকৌশলী (অ. দা.) মো. আলেফ আলী-সহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ।
ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলে নীরবতা পালন করেন এবং তাদের স্মৃতির প্রতি গভীর সম্মান জ্ঞাপন করেন।
বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে রাজশাহীর সর্বস্তরের পেশাজীবী ছাত্র-জনতার গৌরবময় ভূমিকা ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ হয়েছিল রাজশাহী কলেজ মুসলিম ছাত্রাবাস এলাকায়। কিন্তু এই শহীদ মিনারের মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দীর্ঘদিনেও। তবে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণস্থল থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা হলো রাজশাহী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। নির্মিত শহীদ মিনারটি ইতোমধ্যে স্থানীয়দের দৃষ্টি কেড়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন