সকালের প্রথম আলো ফুটতেই স্কুলের পথে হাঁটে শিশুরা। হাতে বই, কাঁধে ব্যাগ, চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের কলাগাছিয়া বাজার সংলগ্ন এলাকায় সেই স্বপ্নগুলো প্রতিদিন ঢেকে যাচ্ছে কালো ধোঁয়ার চাদরে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘মা ব্রিকস’ নামের একটি ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া, ধুলাবালি ও ভারী যানবাহনের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এলাকার পরিবেশ, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য।
সরেজমিনে দেখা যায়, ইটভাটার মাত্র প্রায় ১০০ গজের মধ্যে রয়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভাটার পূর্ব পাশে রয়েছে কলাগাছিয়া হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম পাশে পূর্ব কলাগাছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ ছাড়া অদূরেই অবস্থিত আব্দুল গনি দাখিল মাদ্রাসা, কাছেম গাজী কওমি মাদ্রাসা ও আউয়াল নূরানী মাদ্রাসা।
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, ভাটাটির চারপাশে বসবাস করছে দুই শতাধিক পরিবার। প্রতিদিন তাদের জীবন কাটছে ধোঁয়া, ধুলা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে লড়াই করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভাটার চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া প্রায়ই বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার আঙিনায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক পরিবেশে পাঠ গ্রহণ করতে পারে না।
একাধিক অভিভাবক জানান, শিশুদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, কাশি, অ্যালার্জি ও চোখ জ্বালাপোড়ার সমস্যা বেড়ে গেছে। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে যেতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর অভিভাবক ইদ্রিস কাজী বলেন, ইটভাটার কারণে ধুলাবালির সমস্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারে না। রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় অটোরিকশাও চলতে চায় না। ইটভাটার ধোঁয়ার প্রভাব শুধু মানুষের শরীরেই নয়, পড়ছে কৃষি ও গাছপালার ওপরও।
স্থানীয় বাসিন্দা মনির প্যাদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আমার বাগানে আম, জাম, কাঁঠাল, সুপারি ও নারিকেলসহ কয়েকশ গাছ রয়েছে। কিন্তু ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় গাছগুলোর পাতা ঝলসে যাচ্ছে। অনেক গাছ ধ্বংসের পথে। আমার বাবাও ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে ঢাকায় চিকিৎসাধীন।
তার দাবি, দ্রুত ইটভাটা অপসারণ না করা হলে এলাকার পরিবেশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। ভাঙছে রাস্তা, বাড়ছে দুর্ভোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইট ও মাটি বহনকারী ভারী ট্রলি ও ট্রাকের কারণে এলাকার সড়কগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
মোটরচালক কালাম মল্লিক বলেন, ভাটা হওয়ার পর থেকেই রাস্তার অবস্থা খারাপ। আমরা ভাড়ায় গাড়ি চালাই। চলাচল করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সমস্যায় পড়তে হয়।
গুলিশাখালী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. ফারুক হোসেন আকন বলেন, ইটভাটার কারণে বাজার ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। রাস্তা মেরামত করা হলেও ভারী ট্রলির কারণে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন সংক্রান্ত প্রচলিত আইন অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ। অথচ স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির অতি নিকটে গড়ে উঠেছে এই ভাটা। এতে প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে এমন একটি স্থাপনা পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়েছে?
এ ব্যাপারে মা ব্রিকসের পরিচালক মো. মন্টু মিয়া বলেন, আমরা ভাড়ায় ভাটা পরিচালনা করি। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে, তবে সেটি হালনাগাদ করা হয়নি। চুল্লির উচ্চতা ৬০ থেকে ৬৫ ফুট হওয়ায় ধোঁয়ার কারণে আশপাশের এলাকায় কিছু ক্ষতি হচ্ছে।
বরগুনা জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হায়াত মাহমুদ রকিব বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সরেজমিন তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বরগুনা জেলা প্রশাসক মিছ তাসলিমা আক্তার বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন