রংপুর অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষক বছরের পর বছর ধরে তামাক কোম্পানিগুলোর নানা প্রলোভন ও প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়ে বিষবৃক্ষখ্যাত তামাক চাষে জড়িয়ে পড়েছেন। বিনা মূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক, সুদমুক্ত ঋণ এবং আগাম বাজার নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে কৃষকদের তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করা হলেও মৌসুম শেষে সেই প্রতিশ্রুতির বড় অংশই মিলছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
চলতি মৌসুমে উৎপাদিত তামাকের বড় অংশ কিনতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে বিভিন্ন কোম্পানি। ফলে বিপুল পরিমাণ তামাক নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে খোলা বাজারে তামাক বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। এতে লোকসানের মুখে পড়ে বহু কৃষক এবার প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন—আগামী মৌসুমে তারা আর তামাক চাষ করবেন না এবং অন্যদেরও নিরুৎসাহিত করবেন।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার কৃষক পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তামাক চাষের সঙ্গে জড়িত। অধিকাংশ কৃষক বিভিন্ন দেশি-বিদেশি তামাক কোম্পানির চুক্তিভিত্তিক চাষি হিসেবে কাজ করেন এবং তাদের দেওয়া পরিচয়পত্র বহন করেন।
কৃষকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে তামাক কোম্পানিগুলো লাভজনক চাষের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের তামাক উৎপাদনে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার পর নানা অজুহাতে তামাকের মান খারাপ বলে উল্লেখ করে অধিকাংশ পাতা কিনতে অস্বীকৃতি জানানো হচ্ছে। ফলে কৃষকদের সামনে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ আর্থিক সংকট।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ী গ্রামের কৃষক আব্দুস সাত্তার এ বছর নিজের ১৮ বিঘা জমির পুরোটাতেই তামাক চাষ করেছেন। গত বছর তিনি ১০ বিঘা জমিতে তামাক করেছিলেন। প্রতি বিঘায় প্রায় ৩৬০ কেজি করে তামাক উৎপাদন হলেও এখন সেই ফসল বিক্রি নিয়েই বিপাকে পড়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, কোম্পানির লোকজন আমাদের বলেছিল প্রতি কেজি তামাক ২২০ টাকা দরে কিনবে। কিন্তু এখন মাত্র ২০ শতাংশ তামাক কিনে বাকি তামাকের মান খারাপ বলে ফিরিয়ে দিচ্ছে। বাধ্য হয়ে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে খোলা বাজারে বিক্রি করছি। এক কেজি তামাক উৎপাদনে খরচ হয় ১০০ থেকে ১১০ টাকা।
তিনি আরও বলেন, এতদিন বুঝতে পারিনি আমরা আসলে প্রতারণার ফাঁদে আটকে আছি। এবার বাস্তবতা বুঝেছি। আগামীতে আর তামাক চাষ করব না। আমার প্রতিবেশীদেরও এ চাষ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করব।
কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা রুদ্রেশ্বর গ্রামের আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমরা কৃষি বিভাগের পরামর্শ না শুনে তামাক কোম্পানির প্রতিনিধিদের কথায় বেশি গুরুত্ব দিতাম। কিন্তু এবার বুঝতে পেরেছি তারা আমাদের লাভের চেয়ে নিজেদের ব্যবসার স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
তিনি জানান, গত বছর ৫ বিঘা জমিতে তামাক চাষ করলেও এ বছর কোম্পানির পরামর্শে ১৩ বিঘা জমিতে তামাক করেছেন। এখন লোকসানের মুখে পড়ে তিনি বিকল্প ফসল চাষের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন থেকে কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যশস্য ও অন্যান্য লাভজনক ফসল চাষ করব। তামাক শুধু আমাদের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, স্বাস্থ্য ও পরিবেশেরও ক্ষতি করছে।
এক তামাক কোম্পানির প্রতিনিধি আলী হোসেন জানান, রংপুর অঞ্চলে তামাক কোম্পানিগুলোর প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ কেজি তামাক পাতার চাহিদা রয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ২ হাজার ৭০০ কেজি তামাক উৎপাদন হয়। কিন্তু কৃষকরা এ বছর দ্বিগুণের বেশি জমিতে তামাক চাষ করেছেন। এই অঞ্চলে ৭টি দেশি ও ২টি বিদেশি এবং বেশ কয়েকটি স্থানীয় তামাক কোম্পানি কৃষকদের কাছ থেকে তামাক পাতা ক্রয় করছে। এসব কোম্পানির প্রতিনিধিরা কৃষকদের তামাকচাষে কারিগরি পরামর্শ দিয়ে থাকে। কৃষকরা আমাদের পরামর্শ শোনেননি। গেল বছর তামাকচাষে অপ্রত্যাশিত দাম পাওয়ায় এ বছর বেশি জমিতে তামাক চাষ করেছেন। কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলো চাহিদার তুলনায় বাড়তি তামাক কিনতে পারছে না। এ ছাড়া এ বছর অতিবৃষ্টি ও শিলা বৃষ্টির কারণে তামাক পাতার কোয়ালিটি নষ্ট হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ২১ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। গত বছর এ পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৭৩৪ হেক্টর।
জেলাভিত্তিক হিসাবে লালমনিরহাটে সবচেয়ে বেশি ১৮ হাজার ২২৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। এ ছাড়া রংপুরে ১ হাজার ৮১০ হেক্টর, নীলফামারীতে ১ হাজার ২১০ হেক্টর, গাইবান্ধায় ৩৫ হেক্টর এবং কুড়িগ্রামে ১০ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সফিনুর রহমান বলেন, তামাক গাছ মাটি থেকে বিপুল পরিমাণ পুষ্টি উপাদান শোষণ করে। ফলে জমির উর্বরতা দ্রুত কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এসব জমিতে অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ক্ষমতাও হ্রাস পায়।
লালমনিরহাট জেলা মৎস্য বিভাগের মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াসমিন জানান, তামাক খেতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বেঁচে থাকা হুমকির মুখে পড়ছে।
অন্যদিকে রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, তামাক খেতে কাজ করা নারী, শিশু ও শ্রমিকদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। তামাক পাতার সংস্পর্শে থাকার ফলে বমি, মাথা ঘোরা, জ্বর, পেটের সমস্যা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
আদিতমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের তামাক চাষ থেকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করছি। কিন্তু কোম্পানিগুলোর প্রভাব অনেক বেশি। তবে এ বছর তামাকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এবারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অনেক কৃষক আগামী মৌসুমে তামাক চাষ থেকে সরে আসবেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন