একটি সাত বছরের শিশুর হাসিতে যে উঠোন মুখরিত থাকার কথা ছিল, সেখানে আজ শুধুই কান্নার রোল। বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার বয়সে নিথর দেহে, বস্তাবন্দি হয়ে মাটির নিচে চাপা পড়তে হলো ছোট্ট নন্দিনীকে।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ফলিমারী গ্রামে প্রথম শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার এই নির্মম ঘটনা কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো এলাকার বিবেককে। ক্ষোভে, অভিমানে আর বিচার পাওয়ার আকুতিতে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে গোটা গ্রাম।
নিহত নন্দিনী রানী (৭) ওই উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামের কৃষক নলনী বর্মণের মেয়ে এবং স্থানীয় একটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। গত সোমবার (১৫ জুন) বিকেল থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায় শিশুটি।

স্বজনদের আকুলতা আর খোঁজাখুঁজির অবসান ঘটে মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে, তবে তা কোনো আনন্দের বার্তা নিয়ে আসেনি। বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাক্ষেতে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয় নন্দিনীর বস্তাবন্দি মরদেহ। যে হাতগুলো দিয়ে সে কদিন আগেও খেলা করত, সেই হাতগুলো আজ চিরতরে স্থির।
ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ পারিবারিক সম্পর্কের চাচা বিধানকে (১৯) প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করে আটক করেছে। কিন্তু এই নিষ্ঠুরতা মেনে নিতে পারেনি এলাকাবাসী।
স্বজন হারানোর বেদনা আর ঘাতকের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিমেষেই রূপ নেয় গণবিক্ষোভে। ঘাতক বিধানকে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার সময় উত্তেজিত জনতা পথরোধ করে আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ঘাতকের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জেলা প্রশাসক মুহঃ রাশেদুল হক প্রধান, পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান আসাদ এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে সবার মনে। প্রশাসন যখন আসামিকে নিয়ে ফিরছিল, তখন বিক্ষুব্ধ জনতা ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং ইউএনও’র ব্যবহৃত সরকারি গাড়িগুলো দুমড়েমুচড়ে যায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে এলাকাটি যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়। এদিকে, দায়িত্ব পালনে অবহেলার দায়ে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল ইসলামকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
গ্রামের মোড়ে মোড়ে এখন পুলিশের বুটের আওয়াজ, বাতাসে পোড়া বাড়ির গন্ধ। কিন্তু এই সবকিছুর আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে এক বাবার বুকফাটা আর্তনাদ আর এক মায়ের শূন্য কোল। ফলিমারী গ্রামের ভুট্টাক্ষেতটি হয়তো আবার সবুজ হবে, কিন্তু নলনী বর্মণের ঘরের যে প্রদীপটি চিরতরে নিভে গেল, তা আর কোনোদিন জ্বলবে না। স্তব্ধ গ্রামের একটাই চাওয়া এই নির্মমতার যেন দৃষ্টান্তমূলক এবং দ্রুত বিচার হয়।
লালমনিরহাট সুপার আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, পুলিশের গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হবে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পুরো গ্রামজুড়ে এক থমথমে ও থমকে যাওয়া পরিবেশ বিরাজ করছে। মোতায়েন রয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন