ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

বন্যার পরও মেলেনি পর্যাপ্ত ত্রাণ, বরকলের দুই ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষোভ

রাজস্থলী (রাঙামাটি) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ১২:১৮ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের ভয়াবহ বন্যায় রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল ও বিলাইছড়ি দুই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। বসতবাড়ি, দোকানপাট, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় ও সড়ক যোগাযোগের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও অনেক দুর্গম এলাকায় এখনো পৌঁছেনি প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা। বিশেষ করে বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়ন এবং বরকল উপজেলার ছোট হরিণা ও বড় হরিণা ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রথম দফায় ৬ জুলাই এবং দ্বিতীয় দফায় ৯ জুলাইয়ের বন্যায় ফারুয়া বাজারসহ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যায়। বন্যার আট দিন পেরিয়ে গেলেও অনেক পরিবার এখনো সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো কার্যকর ত্রাণ সহায়তা পায়নি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সীমিত পরিসরে কিছু সহায়তা দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল বলে দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফারুয়া ইউনিয়নের ফারুয়া বাজার, গোয়াইনছড়ি, চাইন্দ্যাছড়ি, শুকরছড়ি, এগুজ্যাছড়ি, যমুনাছড়ি, উলুছড়ি, তক্তানালা ও ওরাছড়িসহ বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ১২ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক পরিবারের বসতঘর পানিতে তলিয়ে গেছে, ফসল নষ্ট হয়েছে, দোকানপাটের মালামাল পানিতে ভেসে গেছে। অথচ দুর্গম এলাকার বহু পরিবার এখনো ত্রাণের অপেক্ষায় দিন গুনছে।

গোয়াইনছড়ি গ্রামের কার্বারি নিরোচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ফারুয়া বাজার ও সড়কের পাশের কিছু পরিবার সহায়তা পেলেও পানছড়ি, চোংড়াছড়ি, পশ্চিম মন্দিরাছড়া ও সাইচল এলাকার পাহাড়ধস ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শতাধিক পরিবার এখনো কোনো সহায়তা পায়নি। তাঁর ভাষায়, ‘যে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে, তা একটি পরিবারের জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।’

তারাছড়ি গ্রামের শিমুল কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, তার বাড়ি সরাসরি প্লাবিত না হলেও দোকানটি পানিতে ডুবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, উপজেলা প্রশাসনের সীমিত সহায়তা ছাড়া এখনো মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে কোনো ত্রাণ পৌঁছেনি। তিনি বলেন, ‘যে পরিমাণ চাল-ডাল দেওয়া হয়েছে, তা একটি পরিবারের জন্য কয়েক দিনের বেশি চলার মতো নয়।’

স্থানীয় বাসিন্দা সুদত্ত তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ফারুয়া ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, “শুধু শুনছি মন্ত্রী-এমপি আসবেন, ত্রাণ দেবেন। কিন্তু এখনো তাদের দেখা মেলেনি। সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে দুর্গম এলাকার মানুষ।”

একই চিত্র দেখা গেছে বরকল উপজেলার ছোট হরিণা ও বড় হরিণা ইউনিয়নেও। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূষণছড়া ইউনিয়নে ত্রাণ বিতরণ হলেও ছোট হরিণা ও বড় হরিণার বহু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এখনো ইউনিয়ন পরিষদের সীমিত সহায়তা ছাড়া আর কোনো ত্রাণ পায়নি।

ছোট হরিণার তারেঙ্গ্যাঘাট এলাকার বাসিন্দা সুবিমল চাকমা বলেন, তারেঙ্গ্যাঘাট, বাজেছড়া, বামে কুকিছড়া ও গুইছড়ি গ্রামের প্রায় ২০০ পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জেলা পরিষদ, সংসদ সদস্য বা অন্য কোনো সংস্থার ত্রাণ সেখানে পৌঁছেনি।

বড় হরিণার কুকিছড়া বাজার এলাকার বাসিন্দা প্রতি বিন্দু চাকমা জানান, শ্রীনগর বাজার, ভাইবোনছড়া, তাগলকছড়া ও কুকিছড়া এলাকার অন্তত ১০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কিছু চাল দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তিনি বলেন, “অন্যান্য এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের দেখা মিললেও বড় হরিণার মানুষ এখনো অপেক্ষা করছে।”

বড় হরিণা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিলাময় চাকমা বলেন, ইউনিয়নে মোট ৭৭টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।

ছোট হরিণা ইউনিয়নের প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান, ১, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ৪৪টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পিআইও কার্যালয়ের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে ত্রাণ বিতরণ করা হবে।

এ বিষয়ে রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ রুহুল আমীন বলেন, ফারুয়া ইউনিয়নের এক হাজার পরিবারের জন্য ত্রাণ প্যাকেজ প্রস্তুত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে এবং নতুন করে ৩০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে পর্যায়ক্রমে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারই বাদ যাবে না।”

বরকল উপজেলার বিষয়ে তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দুই উপজেলার ইউএনওকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়—দুর্গম পাহাড়ি এলাকার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে দ্রুত ও সমন্বিতভাবে পর্যাপ্ত ত্রাণ এবং পুনর্বাসন সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হোক, যাতে তারা দুর্যোগের এই কঠিন সময় থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।