নানা আয়োজন, গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে। রোববার (১৯ জুলাই) গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে দিনব্যাপী কোরআন খতম, মিলাদ মাহফিল, এতিমদের মাঝে খাবার বিতরণ এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রিয় লেখককে স্মরণ করেন তাঁর পরিবার, সাহিত্যিক, নাট্যজন, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা হাজারো ভক্ত-অনুরাগী।
সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে দর্শনার্থীরা নুহাশপল্লীতে ভিড় করতে থাকেন। প্রকৃতি ও বৃষ্টিপ্রেমী হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিবিজড়িত নুহাশপল্লী এদিন যেন পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়। লিচুতলায় অবস্থিত তাঁর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান পরিবারের সদস্য, শুভানুধ্যায়ী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, নাট্যজন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেক ভক্তকে তাঁর সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্র ‘হিমু’র আদলে হলুদ পাঞ্জাবি এবং ‘রূপা’র সাজে উপস্থিত হয়ে প্রিয় লেখকের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে দেখা যায়।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নুহাশপল্লীতে কোরআনখানি, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। হুমায়ূন আহমেদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি আশপাশের কয়েকশ এতিম শিশুর মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়। দিনব্যাপী এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন স্থানীয় বাসিন্দা, দর্শনার্থী এবং লেখকের অসংখ্য পাঠক-ভক্ত।
সকাল সাড়ে ১১টার দিকে প্রয়াত লেখকের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিদকে সঙ্গে নিয়ে নুহাশপল্লীতে পৌঁছান। তাঁরা হুমায়ূন আহমেদের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ দোয়ায় অংশ নেন। এ সময় উপস্থিত ভক্তরাও একে একে সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
নুহাশপল্লীতে আসা দর্শনার্থীরা বলেন, হুমায়ূন আহমেদ শুধু একজন লেখক নন, তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য নাম। তাঁর উপন্যাস, নাটক, চলচ্চিত্র এবং কালজয়ী চরিত্রগুলো আজও পাঠক-দর্শকের হৃদয়ে সমানভাবে বেঁচে আছে। নতুন প্রজন্মও তাঁর সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করছে। তাই তিনি শারীরিকভাবে না থাকলেও তাঁর সৃষ্টি তাঁকে মানুষের হৃদয়ে চিরজাগরুক করে রেখেছে।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর বাবা শহীদ ফয়েজুর রহমান এবং মা আয়েশা ফয়েজ। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ ও চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সৃষ্টি ‘হিমু’, ‘মিসির আলী’, ‘শুভ্র’সহ অসংখ্য চরিত্র বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১২ সালের ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হুমায়ূন আহমেদ। পরে তাঁর ইচ্ছানুযায়ী গাজীপুরের নুহাশপল্লীর লিচুতলায় তাঁকে দাফন করা হয়।
মৃত্যুর ১৪ বছর পরও তাঁর সমাধিতে মানুষের অবিরাম উপস্থিতি, পাঠকদের আবেগ এবং ভক্তদের ভালোবাসাই প্রমাণ করে—হুমায়ূন আহমেদ কেবল একজন লেখক নন, তিনি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তাঁর অমর সাহিত্যকর্ম ও সৃষ্ট চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন