বর্ষার তোড়জোড় কমে পানি নামতে শুরু করলেও কাটেনি সংকট; উল্টো নতুন এবং তীব্র এক বিপাকে পড়েছেন বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার কৃষকরা। উজান থেকে বর্ষার ঢলে ভেসে আসা কচুরিপানার পুরু আস্তরণে ঢাকা পড়েছে উপজেলার বিস্তীর্ণ আবাদি জমি। চারদিকে শুধুই সবুজ কচুরিপানার অনভিপ্রেত জটলা। ফলে চলতি আমন মৌসুমে সময়মতো জমি প্রস্তুত করা এবং ধানের চারা রোপণ করা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও দিশাহারা অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় চাষিরা।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, নদী-নালা, খাল-বিল পেরিয়ে কচুরিপানা জমে আস্তরণ তৈরি করেছে নিচু ও মাঝারি ফসলি জমিগুলোতে। বর্ষার পানি কিছুটা শুকাতে শুরু করলেও সেই কচুরিপানা এখন মাটির সাথে শক্ত হয়ে চেপে বসেছে। ফলে জমি লাঙ্গল দেওয়া তো দূরের কথা, হেঁটে চলাচল করাই দায় হয়ে পড়েছে। স্থানীয় কৃষকরা আক্ষেপ করে জানান, প্রতিবছর আমন মৌসুম এলেই কোনো না কোনোভাবে কচুরিপানার উপদ্রব দেখা দেয়। তবে এবারের চিত্র বিগত যেকোনো বছরের চেয়ে বহুগুণ বেশি ভয়াবহ এবং মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
আবাদি জমির এমন বেহাল অবস্থায় চরম দুশ্চিন্তা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। উপজেলার কোলগ্রাম ও ফেঁপিড়া গ্রামের চাষি মুকুল দাস, দেবখন্দ গ্রামের আব্দুল মান্নান, কৃষক শাজাহান আলী এবং মেহেদী হাসান হতাশা ব্যক্ত করে জানান, প্রতিবছর আমন মৌসুমে ফসল ফলানোর স্বপ্ন দেখলেও জমিতে কচুরিপানার এই আগ্রাসনের কারণে তাদের মূল চাষাবাদ দারুণভাবে ব্যাহত হয়।
কৃষকরা আরও জানান, কচুরিপানা নিধনের জন্য সাময়িকভাবে কীটনাশক বা ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগ করে চেষ্টা চালানো হলেও তাতে স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না। ওষুধ দেওয়ার কিছুদিন পার হতে না হতেই পচে যাওয়া অংশ ভেদ করে পুনরায় নতুন করে কচুরিপানার বিস্তার ঘটে। বাধ্য হয়ে জমি পরিষ্কার করতে বিপুল পরিমাণ বাড়তি শ্রমিক খাটাতে হচ্ছে, যা এমনিতেই চড়া থাকা কৃষি উৎপাদন খরচকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তা ছাড়া বর্তমানে পর্যাপ্ত কৃষি শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সময়মতো জমি প্রস্তুত করতে না পারা এবং কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাওয়ার শঙ্কায় রাত জাগছেন তারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফুল আবেদীন জানান, কচুরিপানা দমনে জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক বা কীটনাশক ব্যবহারে সাময়িক পচন ধরলেও তা দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য, উর্বরতা ও অণুজীবের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর হতে পারে।
তিনি বলেন, আমরা কৃষকদের ক্ষতিকর রাসায়নিক না দিয়ে ম্যানুয়ালি বা দলবদ্ধভাবে কচুরিপানা তুলে ফেলার উৎসাহিত করছি। একই সাথে জমিতে জমা করা এসব কচুরিপানা পচিয়ে তা দিয়ে মাটির জন্য অত্যন্ত উপকারী জৈব সার ও কম্পোস্ট তৈরির পরামর্শ দিচ্ছি। এতে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা বজায় থাকার পাশাপাশি সার কেনার খরচও কিছুটা সাশ্রয় হবে। চলতি আমন চাষাবাদ নির্বিঘ্ন রাখতে মাঠপর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সরেজমিনে জমি পরিদর্শনে যাচ্ছেন এবং কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দিতে সার্বক্ষণিক পাশে রয়েছেন।
তবে কৃষি বিভাগের এই পরামর্শের পাশাপাশি কৃষকদের মূল দাবি ভিন্ন। তারা বলছেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা সামান্য কজন শ্রমিক দিয়ে শত শত বিঘা জমির এত বিশাল পরিমাণের কচুরিপানা সরানো বাস্তবে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এতে ধান রোপণের উপযুক্ত সময় পার হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই বার্ষিক ও মৌসুমি দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পেয়ে সময়মতো আমন চাষাবাদ সচল রাখতে অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান বা আর্থিক ও যান্ত্রিক সহায়তার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী প্রান্তিক কৃষকরা।

