ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ছয় দশক ধরে হাদিয়া ছাড়াই তারাবি পড়ান মমিনপুর মাদ্রাসার হাফেজরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চাঁদপুর
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬, ১০:৪৬ এএম
চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদি ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মমিনপুর মাদ্রাসা। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদি ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মমিনপুর মাদ্রাসা মসজিদে গত ছয় দশক ধরে হাফেজরা কোনো হাদিয়া ছাড়াই খতমে তারাবির নামাজ আদায় করে আসছেন।

শুধু তাই নয়, এই মাদ্রাসায় হিফজ সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে মমিনপুর গ্রামের আরও ১৫টি মসজিদে একযোগে তারাবির নামাজ পড়ানো হয়—সেখানেও নেওয়া হয় না কোনো হাদিয়া। হিফজ বিভাগের জন্য বিশ্বজুড়ে সুনাম রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের।

সরেজমিনে মাদ্রাসা ও মসজিদ সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান

জেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মাদ্রাসা ও মসজিদটি রিকশা বা অটোবাইকে সহজেই যাওয়া যায়। নদীপথেও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পৌঁছানো সম্ভব। চান্দ্রা-গল্লাক সংযুক্ত পাকা সড়ক থেকে উত্তর-পশ্চিমে সাহেব বাজার এবং পূর্ব দিকে মাদ্রাসার ক্যাম্পাস।

ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা এই মাদ্রাসার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর। দক্ষিণ দিক থেকে শুরু হয়েছে মাদ্রাসা ভবন, মাঝখানে নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন দ্বিতল মসজিদ। নকশায় অনন্য এই মসজিদে একসঙ্গে অন্তত ৫০০ থেকে ৬০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

প্রতিষ্ঠাতার আদর্শে হাদিয়াবিহীন তারাবি

মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা কেফায়েত উল্লাহ বলেন, জেলা সদরের বিভিন্ন মসজিদে তারাবি পড়ানো হাফেজদের হাদিয়া দেওয়া হলেও মমিনপুর মাদ্রাসা ব্যতিক্রম। এখানে কখনো হাদিয়া দেওয়া-নেওয়ার প্রচলন ছিল না, এখনো নেই। মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম হাফেজ মাওলানা মুহসিন (রহ.) এই ধারা চালু করেন।

এ বছর মাদ্রাসা মসজিদে খতমে তারাবি পড়াচ্ছেন হাফেজ মো. মাহমুদ ও হাফেজ ওবায়দা। হাফেজ মাহমুদ জানান, তিনি টানা দুই বছর এখানে তারাবি পড়াচ্ছেন এবং কখনোই হাদিয়া নেননি। বিনিময় ছাড়া ইবাদত করতে পেরে তিনি আনন্দিত।

হাফেজ ওবায়দা বলেন, তিন বছর ধরে তিনি এ মসজিদে তারাবি পড়াচ্ছেন। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়া ইবাদত করতে পারা তার কাছে সৌভাগ্যের।

মুসল্লিদের সন্তুষ্টি

একাধিক মুসল্লি জানান, দ্বিতল মসজিদের নকশা অত্যন্ত সুন্দর। গ্রামের বহু মানুষ এখানে পাঁচ ওয়াক্ত ও জুমার নামাজ আদায় করেন। নিচতলা ও ওপরতলায় সমান সংখ্যক মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। খোলামেলা পরিবেশের কারণে মসজিদের ভেতরে শীতল আবহ বিরাজ করে।

দেশজুড়ে ঐতিহ্যের স্বীকৃতি

১৯৮৮ সালে এই মাদ্রাসা থেকে হিফজ সম্পন্ন করেন সদর উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের হাফেজ আব্দুল বারেক। তিনি বলেন, এই হিফজ মাদ্রাসার ঐতিহ্য দেশজুড়ে সুপরিচিত। এখানকার হাফেজদের তারাবি পড়ানোর জন্য কোনো সাক্ষাৎকার দিতে হয় না। হিফজের পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক শিক্ষায়ও গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেশ-বিদেশে নানা পেশায় যুক্ত থেকে মাদ্রাসার হাজারো শিক্ষার্থী নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন।

মাদ্রাসার মুহতামিম হাফেজ রাশেদ বলেন, প্রতি বছর হিফজ সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরাই মমিনপুর গ্রামের সব মসজিদে খতমে তারাবি পড়ান। প্রতিটি মসজিদে দুই থেকে চারজন হাফেজ দায়িত্ব পালন করেন। তারাবি শেষে মুসল্লিদের মিষ্টি খাওয়ানোর মাধ্যমে দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটে।

তিনি আরও জানান, প্রায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চাচা হাফেজ ফজলুর রহমান এই মসজিদে খতমে তারাবি পড়িয়েছেন। তাঁর ইন্তেকালের পর শিক্ষার্থীরাই সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।