একসময় কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ পাহাড়জুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত গর্জন বন। এই বন শুধু পাহাড়কে সবুজে আচ্ছাদিত রাখেনি, বরং অসংখ্য বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল, পাহাড়ি ঝিরি-ঝরনার প্রাণ এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নির্বিচারে বন উজাড়, অবৈধ দখল, অগ্নিসংযোগ ও অপরিকল্পিত ব্যবহারের ফলে এই প্রাকৃতিক বন প্রায় বিলুপ্তির মুখে পড়ে।
তবে দীর্ঘদিনের সেই হতাশার পর দেখা দিয়েছে আশার আলো। প্রকৃতি যেন নিজেই নিজের ক্ষত সারিয়ে তোলার কাজ শুরু করেছে। কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার গর্জনের চারা। বন বিভাগের ভাষায়, এটি গর্জন বনের 'প্রাকৃতিক পুনরুত্থান' (Natural Regeneration), যা দেশের বন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক ঘটনা।
সম্প্রতি সরেজমিনে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জের মেধাকচ্ছপিয়া, খুটাখালী ও ফাঁসিয়াখালী এলাকার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে দেখা যায়, বড় বড় গর্জন গাছের নিচে স্বাভাবিকভাবেই জন্ম নিয়েছে শত শত নতুন চারা। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান উচ্চতার চারায় ঘন সবুজে ছেয়ে গেছে বনভূমির মাটি।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার হেক্টর এলাকায় এই প্রাকৃতিক পুনরুত্থানের চিত্র স্পষ্ট। গাছ থেকে ঝরে পড়া বীজ মাটিতে অঙ্কুরিত হয়ে নতুন চারায় পরিণত হচ্ছে। মানুষের রোপণ নয়, প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই বনটি আবার নিজের অস্তিত্ব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে।
ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কুদ্দুসুর রহমান বলেন, যথাযথ সংরক্ষণ ও নিয়মিত পাহারার কারণে গর্জনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম ঘটছে। এসব চারা সঠিকভাবে রক্ষা করা গেলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে আবারও বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে উঠবে ঘন গর্জন বন।
গর্জন বনের পুনরুজ্জীবনের সঙ্গে সঙ্গে ফিরতে শুরু করেছে হারিয়ে যাওয়া বন্যপ্রাণীও। বন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় এখন নিয়মিত দেখা মিলছে বন্য হাতি, হরিণ, বানর, বনমোরগ, শেয়াল, নানা প্রজাতির সাপ এবং দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির।
যে বন একসময় গাছ কাটার শব্দ, দখলদারিত্ব ও অগ্নিকাণ্ডে নীরব হয়ে পড়েছিল, সেখানে এখন আবার শোনা যাচ্ছে পাখির কলতান এবং বন্যপ্রাণীর চলাচলের শব্দ। পরিবেশবিদদের মতে, এটি একটি সুস্থ বনজ বাস্তুতন্ত্র ফিরে আসার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
পরিবেশবিদ ও বন বিশেষজ্ঞ মো. ছাদেকুর রহমান এবং আবদু শুক্কুর বলেন, গর্জন শুধু একটি বৃক্ষ নয়; এটি পুরো পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি। গর্জন বন পাহাড়ের মাটি দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে, ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি কমে। পাশাপাশি পাহাড়ি ঝিরি, ছড়া ও পানির উৎস সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তারা আরও বলেন, গর্জন বন বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সহায়তা করে। বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে এই বন পুনরুত্থান বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি ঘটনা।
বন বিভাগ জানায়, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, বন পাহারা জোরদার, অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার ফলে বনাঞ্চলে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। মানুষের চাপ কমে যাওয়ায় গর্জন গাছের বীজ স্বাভাবিকভাবে অঙ্কুরিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. কামরুল হাসান বলেন, প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া চারাগুলো কৃত্রিমভাবে রোপণ করা গাছের তুলনায় অধিক শক্তিশালী ও পরিবেশ উপযোগী। তাই এগুলো সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে আরও টেকসই বন গড়ে উঠবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও বনাঞ্চলে গর্জনের চারা খুব একটা চোখে পড়ত না। এখন পাহাড়জুড়ে নতুন সবুজের বিস্তার তাদেরও আশাবাদী করে তুলেছে। তাদের মতে, বন রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা গেলে এই পুনর্জাগরণ দীর্ঘস্থায়ী হবে।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বলেন, গর্জন বনের এই পুনর্জাগরণ কেবল কয়েকটি গাছের জন্ম নয়; এটি পুরো বনজ বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ইতিবাচক ইঙ্গিত। বন সংরক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ে আবারও বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক গর্জন বন গড়ে উঠবে।
তিনি আরও বলেন, এই বন শুধু জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণই করবে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, পাহাড় রক্ষা, পানির উৎস সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হারিয়ে যেতে বসা একটি বন যখন মানুষের কৃত্রিম সহায়তা ছাড়াই আবার নিজের শক্তিতে ফিরে আসতে শুরু করে, তখন সেটি শুধু পরিবেশগত ঘটনা নয়, বরং প্রকৃতির পুনর্জীবনের এক বিরল দৃষ্টান্ত। কক্সবাজারের গর্জন বনের এই পুনরুত্থান তাই শুধু একটি বন ফিরে আসার গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু অভিযোজন এবং টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য এক অনুপ্রেরণাদায়ক সবুজ বার্তা।

