পড়াশোনা শেষ করে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন মামুনুর রশিদ। স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। কিন্তু ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালু করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আবশ্যক। আর এই ছাড়পত্র পেতে প্রয়োজন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিস, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন।
মামুনুর রশিদ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তিনটি অফিসে জমা দেন। কিন্তু পরদিনই তার কাছে একটি অজানা নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে ডা. সুমন হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি জানান, তার সহায়তা না নিলে ডায়াগনস্টিকের ছাড়পত্র মিলবে না। একপর্যায়ে মামুনুর রশিদ জিম্মি হয়ে এই তথাকথিত ডা. সুমনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ছাড়পত্র পান।
শুধু মামুনুর রশিদ নয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক মালিকদেরও একইভাবে জিম্মি করেছে সুমন সিন্ডিকেট। সুমনের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন মিজানুর রহমান মিজান।
সুমনের পরিচয় ও প্রভাব
সুমন হলেন চাঁপাইনবাগঞ্জ পৌরসভার বটতলা এলাকার গোলাম নবীর ছেলে। তার সহকারী মিজানুর রহমান মিজানও একই এলাকায় বসবাস করেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুমন কখনো নিজেকে চিকিৎসক, আবার কখনো স্বাস্থ্য মন্ত্রাণলয়ের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। বেসরকারি ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়নসহ যাবতীয় কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি দীর্ঘদিনে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।
সুমন বিভিন্ন সরকারি হাসপাতলে নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বা চিকিৎসকদের পোস্টিং দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেন। তার প্রভাবশালী পরিচিতি ছিল আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালী স্বাচিপ নেতা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডা. সামিউল হক সাদির সাথে।
মামুনুর রশিদের অভিজ্ঞতা
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বেসরকারি ক্লিনিক জারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মামুনুর রশিদ জানান, ২০২২ সালে তিনি ডায়াগনস্টিক সেন্টার দেওয়ার জন্য সিভিল সার্জন অফিসে যান। কিছু কাগজপত্র সংগ্রহের পর তার কাছে ফোন আসে, যিনি নিজেকে ডা. সুমন পরিচয় দেন। তিনি জানান, সিভিল সার্জন অফিস ঘুরে কোনো লাভ নেই; লাইসেন্স করতে হবে তার মাধ্যমে।
একপর্যায়ে তিনি জিম্মি হয়ে সব কাগজপত্র সুমনের হাতে দিয়ে লাইসেন্স করান মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে। আবারও নবায়ন করতে গেলে একই সিন্ডিকেটের ফাঁদে পড়ছেন ক্লিনিক মালিকরা।
সুমনের সিন্ডিকেটের শিকার যারা
রুমন নামে এক ব্যক্তি বলেন, তার স্ত্রী সিনিয়র নার্স পদে চাকরি করেন। সুমন জানতেন, তার স্ত্রী দূরবর্তী জেলায় কর্মরত। এরপর তিনি ফোন করে বলেন, ‘আমি আপনার স্ত্রীকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় পোস্টিং করে দেব।’ এইভাবে টাকা হাতিয়ে নেন, কিন্তু পোস্টিং দেননি।
এক চিকিৎসক জানান, রাজনৈতিক কারণে তার পদোন্নতি আটকে ছিল। পদোন্নতি করিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারে সুমন ৮ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। অন্যান্য চিকিৎসকেরাও তার মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন।
বেসরকারি ক্লিনিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল ইসলাম ডলার বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্লিনিকগুলোর লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন লাইসেন্স প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত। পরিবেশ, ড্রাগ ও ফায়ার অফিসেও ঝামেলা হচ্ছে, যার মূল কারণ সুমন সিন্ডিকেট।
ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি ও ড্যাব জেলার আহ্বায়ক ডা. ময়েজ উদ্দিন জানান, সমিতির সদস্যরা সুমনের জিম্মি হয়ে পড়ছেন। সিভিল সার্জন অফিসসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নিয়মমাফিক কাজ করতে পারছেন না। প্রশাসনের নজরদারি প্রয়োজন।
সরকারি কর্মকর্তাদের অভিমত
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিসের সাবেক কর্মকর্তা বলেন, সুমন নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে সিভিল সার্জন অফিসে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছেন। তবে তিনি তাদের পাত্তা দেননি। পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আবু সাঈদ বলেন, ‘তাদের অফিসে কোনো দালাল সিন্ডিকেট কাজ করতে পারে না।’
সিভিল সার্জন ডা. এ.কে.এম শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘সুমনের সাথে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক লাইসেন্স নবায়ন সরকারি টিম পরিচালনা করে।’
সিন্ডিকেটের কাঠামো
সুমনের সহযোগী মিজান, আর্থিক লেনদেন ও সম্পত্তি দেখাশোনার কাজ করেন। মিজান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, বলেছেন তিনি শুধুই টাকা ধার নেন, সুমনের কর্মকাণ্ড জানেন না।
জন্ম সনদ অনুযায়ী, সুমন ১৯৯৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন, বয়স ৩০-এর আশপাশে। অতি সাধারণ পরিবারের সন্তান, কিন্তু এখন কয়েক কোটি টাকার মালিক। জোড়গাছি এলাকায় তিন তলা বিশাল বাড়ি, নাচোল-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের পাশে বাড়ি, চার বিঘা জমি এবং অন্যান্য এলাকায় কয়েক কোটি টাকার বিভিন্ন সম্পদ রয়েছে।
সাধারণ পরিবারের পিতা মুদি ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। হঠাৎ কোটি টাকা খরচ করে বাড়ি নির্মাণ ও সম্পদ সঞ্চয় তাকে এলাকার মানুষকে বিস্মিত করেছে।
রাজনৈতিক পরিচিতি
সুমনের পরিচয় সৃষ্টি হয় স্বাচিপ ও বিএমএ নেতাদের সাথে। বিশেষ করে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ডা. গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে তার সখ্যতা ছিল। ক্লিনিক মালিকরা কাজ নিয়ে গেলে ডা. গোলাম রাব্বানী তাকে দেখিয়ে দিতেন, যার ফলে সুমন ক্লিনিক মালিকদের জিম্মি করতে পারত।
ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি
চাঁপাইনবাবগঞ্জে মোট ১৫৫টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। বেশির ভাগ ভাড়া ভবনে পরিচালিত, যা আংশিক পরিবর্তন করে ক্লিনিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফায়ার ও পরিবেশ ছাড়পত্রের জটিলতা সুমনের সিন্ডিকেটকে সুযোগ দিয়েছে।
চিকিৎসক ও মেডিকেল স্টাফরা নিজের জেলায় পোস্টিং বা প্রাইভেট প্রাকটিসের জন্য সিন্ডিকেটের ফাঁদে পড়ছেন।



