টানা পাঁচ দিনের প্রবল বর্ষণ, পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও উত্তাল সমুদ্রের তাণ্ডবে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের অন্যতম পর্যটন জেলা কক্সবাজার। গত কয়েক দিনের দুর্যোগে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে অন্তত ২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা সেন্টমার্টিন দ্বীপসংলগ্ন উপকূল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তিনটি অজ্ঞাতনামা মরদেহ।
পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা, সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং উত্তাল সমুদ্র, সব মিলিয়ে কক্সবাজারের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে এ পরিস্থিতি।
অবিরাম বৃষ্টিতে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। শহর থেকে গ্রাম, প্রায় সর্বত্রই দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। বিভিন্ন এলাকায় ভেঙে পড়েছে সড়ক, কালভার্ট ও পাহাড়ি সংযোগপথ। নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, অন্তত ৩০ হাজার মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে। কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ১৬ জনের প্রাণহানির পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারী হাজারও রোহিঙ্গাকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র ও লার্নিং সেন্টারে সরিয়ে নেওয়া হলেও অব্যাহত বৃষ্টিতে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে শিবিরজুড়ে।
দুর্যোগের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। বুধবারের প্রবল বর্ষণের মধ্যে পাহাড়ধসে একটি মাদ্রাসা ও মক্তবের ওপর মাটি চাপা পড়ে আট শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। আহত হয় আরও ৫/৬ জন শিক্ষার্থী। স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, এপিবিএন, স্বেচ্ছাসেবক ও রোহিঙ্গারা কয়েক ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানে অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থীকে জীবিত উদ্ধার করেন। গুরুতর আহত ৫ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ মোট ২০ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলী, ছাত্তারঘোনা, উখিয়া, চকরিয়া ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। অনেক পরিবার মুহূর্তেই হারিয়েছে তাদের স্বজন ও বসতভিটা। দুর্ঘটনাস্থলগুলোতে এখনো ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
দুর্যোগের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো বঙ্গোপসাগরের অস্বাভাবিক উত্তাল অবস্থা। পাঁচ দিন ধরে প্রবল বাতাস ও জোয়ারের প্রভাবে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত উত্তাল রয়েছে। সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে লাল পতাকা উড়িয়ে পর্যটকদের সাগরে নামতে নিষেধ করেছে জেলা প্রশাসন ও লাইফগার্ড কর্মীরা। নিরাপত্তার স্বার্থে পর্যটকদের বারবার মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
সমুদ্র উত্তাল থাকায় মাছ ধরার ট্রলার, ফিশিং বোট ও ছোট নৌযানকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনেক জেলে কয়েক দিন ধরে সাগরে যেতে পারেননি। ফলে উপকূলীয় এলাকার জেলেদের জীবিকায়ও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। মাছ আহরণ বন্ধ থাকায় স্থানীয় মৎস্যঘাটগুলোতেও কর্মচাঞ্চল্য কমে গেছে।
বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে সেন্টমার্টিন নৌপথেও। উত্তাল সাগর ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দ্বীপে নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে সেন্টমার্টিন দ্বীপসংলগ্ন উপকূল থেকে তিনটি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সেগুলো স্থানীয় জেলে, নিখোঁজ কোনো ব্যক্তি, নাকি সমুদ্রপথে ভাসতে ভাসতে এসেছে, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।
টানা বর্ষণে কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ নাগরিক চরম দুর্ভোগে পড়েন। অনেক এলাকায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। নিম্নাঞ্চলের বহু পরিবার ঘরবন্দি হয়ে পড়ে। শহরের বিভিন্ন বাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া স্থগিত করা হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা, বিশেষ করে উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, পেকুয়া ও মহেশখালীতে পাহাড়ি ঢাল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় অনেক পরিবার স্বেচ্ছায় নিরাপদ স্থানে চলে গেছে। প্রশাসনও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে দ্রুত সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং ও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালার প্রভাবে কক্সবাজারসহ উপকূলীয় এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। অতিভারী বৃষ্টির কারণে নতুন করে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্র উত্তাল থাকায় উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা, পর্যটক ও জেলেদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ত্রিপল ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আরও মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারের পাহাড় কেটে অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণ, পাহাড়ের পাদদেশে জনবসতি বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার প্রবণতা বাড়ায় প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব নয়।
প্রকৃতির এই দীর্ঘস্থায়ী বৈরী রূপে একদিকে যেমন থমকে গেছে পর্যটননির্ভর কক্সবাজারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, অন্যদিকে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে তৈরি হয়েছে নতুন মানবিক সংকট। অব্যাহত বৃষ্টি, পাহাড়ধসের আশঙ্কা এবং উত্তাল সমুদ্রের কারণে জেলার লাখো মানুষের মধ্যে এখনো উদ্বেগ কাটেনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখার পাশাপাশি অপ্রয়োজনে পাহাড়ি এলাকা ও সমুদ্রে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

