ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফুলবাড়ীর দুই ইউনিয়নের দেড় হাজার বিঘা ধানখেত পানির নিচে

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ১০:০৪ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে টানা কয়েক দিনের ঝড়োবৃষ্টিতে দুই ইউনিয়নের ১০ গ্রামের দেড় হাজার বিঘা বোরো ধানখেত জলাবদ্ধতার পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। কোমর সমান পানিতে নেমেই ধান কাটার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা। তলিয়ে যাওয়া খেতের ধান কেটে রাখার জায়গা না থাকায় সেগুলো ভেলায় ঠেলে ডাঙায় এনে রাখতে হচ্ছে।

স্বপ্নের ধান ঘরে তোলার আগেই জলাবদ্ধতার কারণে বোরো খেত পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন এলাকার দুই শতাধিক কৃষক।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ৫নং খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর, মহেশপুর, লালপুর, মহদিপুর, পূর্ব নারায়ণপুর এবং ৬নং দৌলতপুর ইউনিয়নের গড়পিংলাই, বারাইপাড়া, আড়াপাড়া, ঘোনাপাড়া, গণিপুর ও পলিপাড়াসহ ১০ গ্রামের প্রায় দেড় হাজার বিঘা ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে।

কৃষকরা চড়া দামে মজুর নিয়ে চার-পাঁচদিন ধরে কোমরসমান পানির নিচে তলিয়ে থাকা খেতের ধান কাটতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ইতোমধ্যে ডুবে থাকা ক্ষেতের ধান অনেকটাই পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

জানা যায়, ভুক্তভোগী কৃষকদের আন্দোলন-সংগ্রামের পর জমির জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে জাইকা প্রকল্পের অর্থায়নে এলজিইডির ব্যবস্থাপনায় ২০২০ সালে প্রথম পর্যায়ে ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে উপজেলার দৌলতপুর বারাইপাড়া এলাকায় ১৬৩ মিটার ক্যানেল (ড্রেন) নির্মাণ করা হয়।

দ্বিতীয় পর্যায়ে ১১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৪৩ মিটার ক্যানেল সম্প্রসারণ করা হয়। এতে ২০৬ মিটার দীর্ঘ ক্যানেল নির্মাণে ৫৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ব্যয় হলেও শুধুমাত্র তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলীর অজ্ঞতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে ক্যানেলটি ভুক্তভোগী কৃষকদের সুফল বয়ে আনেনি।

উপরন্তু জমি থেকে ক্যানেলটি অন্তত দেড় থেকে দুই ফুট উঁচুতে নির্মাণ করায় আগের চেয়ে আরও বেশি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে কমবেশি বছরজুড়েই ওই জমিতে চাষাবাদ বন্ধ থাকছে।

এদিকে ঝুঁকি নিয়ে বোরো আবাদ করলেও ধান ঘরে তোলার আগমুহূর্তে কয়েকদিনের ঝড়োবৃষ্টিতে পানিতে তলিয়ে আছে কৃষক আইয়ুব আলীর চার বিঘা, মোস্তাফিজার রহমানের ৩২ বিঘা, মো. বাবুর ১৮ বিঘা, জয়নাল আবেদিনের ৬ বিঘাসহ অসংখ্য কৃষকের জমি।

তারা বলেন, ধান কাটার আগমুহূর্তে বৃষ্টির পানিতে কোমরসমান পানির নিচে ডুবে যাওয়া ধান বিঘাপ্রতি ১০ হাজার টাকা চুক্তিতে কাটতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগী কৃষক মতিবুল রহমান, মিজানুর রহমান, আশরাফুল ইসলাম ও আবু মুসা বলেন, আগে এসব জমিতে চাষাবাদ হলেও স্থানীয় প্রভাবশালীরা অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খননের কারণে বন্ধ হয়ে যায় জমির পানি নিষ্কাশনের পথ।

ফলে জলাবদ্ধ হয়ে আছে প্রায় দেড় হাজার বিঘা আবাদি জমি। সমস্যা নিরসনে ক্যানেল নির্মাণ করা হয়। এতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি, উল্টো সরকারের অর্ধকোটি টাকা গচ্ছা গেছে। ক্যানেল তৈরি করা হলেও তা পরিকল্পনামাফিক করা হয়নি। এ কারণে ওই ক্যানেল দিয়ে পানি প্রবাহের পরিবর্তে জমিতে আরও বেশি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

দীর্ঘ ২০ বছর ধরে পানির নিচে ফসলি জমি তলিয়ে থাকায় চাষাবাদ করা যাচ্ছে না। একই কারণে প্রয়োজনের তাগিদে জমি বেচাকেনাও করা যাচ্ছে না।

বিষয়টি নিয়ে কথা বললে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির কারণে ওই সব এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। জলাবদ্ধতার মূল কারণ ওই এলাকার অপরিকল্পিত পুকুর খনন। পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে। আমরা ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি।

অল্প পানি থাকা জমিতে কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন নামতে পারলেও বেশি পানিতে নামানো সম্ভব হয় না। ইউএনও সাহেবের সঙ্গে কথা বলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এর স্থায়ী সমাধান করতে হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হাছান বলেন, জলাবদ্ধতা হওয়ার আগে কয়েক দফা ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি। সেখানে আমরা কিছু টেকনিক্যাল ত্রুটি পেয়েছি, যা ক্যানেল নির্মাণের সময় হয়েছিল।

এই মুহূর্তে এর কোনো সমাধান সম্ভব নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। শিগগিরই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে সরেজমিনে এনে বড় পরিসরে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।