ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

হাসপাতাল : সুখ-দুঃখের নানান উপাখ্যান

মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ রাব্বী
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২০, ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম
জামালপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল। ছবি- সংগৃহীত

হাসপাতাল—নামটা শুনলেই অনেকের মনে আতঙ্কের জন্ম দেয়। এখানে সবকিছুই অনিশ্চিত। কার কখন কী হয় তা বলা যায় না। কখনো কেউ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়, আবার কেউ সামান্য অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে এসে নিথর দেহ হয়ে ফিরে যায় অন্যের কাঁধে ভর করে। এই সবকিছুর মাঝেও হাসপাতালে তৈরি হয় নানান গল্প-উপাখ্যান।

বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। সমাজের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা চিকিৎসা নেন বেসরকারি হাসপাতালে। আর অর্থাভাবে নিম্নবিত্তদের জায়গা হয় সরকারি হাসপাতালে। এ কারণে সরকারি হাসপাতালের গল্পগুলোও হয় ভিন্ন। এখানে অহমিকা কম, মানুষ সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

এমনই এক চিত্র দেখা যায় জামালপুর জেলার ‘২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে’। জরুরি বিভাগ ভবনের পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে লক্ষ করা যায়, এখানে প্রতিটি বেডের রোগী ও তাদের সঙ্গে থাকা স্বজনরা একে অপরের পূর্বপরিচিত না হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে ওঠেছে। তারা একসঙ্গে করছেন জীবনের নানা সুখ-দুঃখের গল্প।

মহিলা ওয়ার্ডে কথা হচ্ছিল ষাটোর্ধ্ব ছাহেরা খাতুনের সঙ্গে। হার্টের সমস্যায় তিনি দুই দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। ভালা হাসপাতালো ডাক্তর দেহাবার এত টেহা কোডাই পামু?’ ছাহেরা খাতুনের পরিবারে এখন কেউ নেই। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই। রয়েছে একটি কন্যাসন্তান। তাকেও বিয়ে দিয়েছেন নিতান্তই গরিব পরিবারে। তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। তবুও মেয়েটি সামর্থ্য অনুযায়ী মাকে টুকটাক আর্থিক সহায়তা করে থাকেন।

ছাহেরা খাতুনের মেয়ে দিনে একবার এসে মাকে দেখে যান। বাকি সময় ছাহেরা খাতুনকে একাই থাকতে হয়। তবে এই দুই দিনের মধ্যেই পাশের বেডের রোগীর এক স্বজনের সঙ্গে তার বেশ ভাব জমে উঠেছে। তার সঙ্গেই নানান সুখ-দুঃখের গল্প করেন তিনি। কিছুক্ষণ তাদের গল্প শোনার পর মনে হয়েছে, তারা বুঝি বহুদিনের পরিচিত। অথচ বাস্তবে তাদের পরিচয় মাত্র দু’দিনের।

ছাহেরা খাতুনের মতো এমন চিত্র আরও অনেকের মধ্যেই দেখা যায় ওই মহিলা ওয়ার্ডে। জরুরি বিভাগ ভবনের তৃতীয় তলায় সার্জারি বিভাগের পুরুষ ওয়ার্ডেও দেখা যায় ভিন্ন বাস্তবতা। এখানে সাধারণত ভর্তি হন বিভিন্নভাবে আহত ও দুর্ঘটনার শিকার রোগীরা। এখানে প্রতিটি রোগীর সঙ্গেই আছেন তিন-চার জন স্বজন। তারা রোগীর সেবা-শুশ্রূষায় ব্যস্ত।

এই ওয়ার্ডে ভিন্ন একটি চিত্র চোখে পড়ে। চার-পাঁচ বছরের কয়েকজন শিশু একসঙ্গে দৌড়াদৌড়ি ও খেলাধুলা করছে। তারা হয়তো আগে কখনো একে অপরকে দেখেনি। কিন্তু হাসপাতালে আসার পর তারা সবাই একে অপরের বন্ধু। যদিও এখানে কাটানো সময়গুলো ভবিষ্যতে তাদের মনে থাকবে না।

একটি বেডে, রোগীর পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে চার বছরের একটি শিশু। রোগীটি তার বাবা। মাথায় আঘাত পেয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। থাকতে হবে আরও কয়েকদিন। ততদিন শিশুটিও থাকবে এই হাসপাতালেই। এখানেও মহিলা ওয়ার্ডের মতো একই দৃশ্য দেখা যায়।

রোগীর স্বজনদের একজনের সঙ্গে আরেকজনের গড়ে উঠেছে সখ্যতা। নিজেদের সময় কাটাতে তারা একে অপরের সঙ্গে গল্প করছেন। কেউ কেউ খাবার ভাগাভাগি করে খাচ্ছেন। যদিও আগে তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল না, ভবিষ্যতেও নাও দেখা হতে পারে—তবুও এই সময়টুকুতে তারা আপনজনের মতো মিলেমিশে আছেন।

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর পরিবেশ খুব একটা ভালো নয়—বিশেষ করে মফস্বল এলাকার হাসপাতালগুলোর অবস্থা বেশ করুণ। কিন্তু এখানে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের অধিকাংশই গরিব। তাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। এই বাস্তবতার মাঝেই তারা মানিয়ে নেন। আর এখানেই তৈরি হয় তাদের জীবনের সুখ-দুঃখের নানান উপাখ্যান।