বাড়ির বাইরের উঠানের এক কোণে বারান্দায় পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় বসে আছেন বৃদ্ধ শফিকুল ইসলাম (৮০)। এভাবেই ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কেটে গেছে তার জীবনের প্রায় ৪০ বছর। এলাকার সম্পদশালী ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও এই বৃদ্ধের ঠাঁই হয়নি নিজের পাকা বাড়ির কোনো কক্ষে।
শফিকুল ইসলাম লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের লতাবর গ্রামের বাসিন্দা। উত্তর বালাপাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে তার পাকা বাড়িতে স্ত্রী ও সন্তানরা বসবাস করেন। অথচ সেই বাড়ি থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে বাঁশবাগানের নিচে একটি গুদামঘরের খোলা বারান্দায় দিন কাটছে তার।
পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, যৌবনে তেজদীপ্ত ও পরিশ্রমী ছিলেন শফিকুল ইসলাম। ভোর হলেই কোদাল-কাস্তে ও গরু-বাছুর নিয়ে নিজের জমিতে চলে যেতেন। হালচাষ করে চলত তার সংসার। প্রতি বছর ফসল বিক্রি করে জমি কিনতে কিনতে প্রায় ২৫ দোন জমির মালিক হন তিনি (এক দোনে ২৭ শতাংশ)। স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে ছিল তার সুখের সংসার। বড় মেয়ে রেহানা বেগম বর্তমানে চন্দ্রপুর ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, যৌবনের শেষ দিকে হঠাৎ পারিবারিক নানা চাপে মানসিক ভারসাম্য হারান শফিকুল ইসলাম। প্রথমে কবিরাজের মাধ্যমে তাবিজ-কবজ ও বিভিন্ন চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হয়ে দিন দিন অবনতি হতে থাকে।
একসময় পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘শফিকুল পাগলা’ নামে। জমি বিক্রি করা সম্ভব না হওয়ায় চিকিৎসাও বাধাগ্রস্ত হয়। পরে জমি বন্ধক রেখে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কিছুদিন চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
এরপর থেকেই বাড়ির উঠানের এক পাশে গুদামঘরের খোলা বারান্দায় শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয় তাকে। একটি কাঠের চৌকিতে বসেই কেটে যাচ্ছে তার চার দশক। ওই বারান্দাতেই খাওয়া, থাকা ও শৌচকাজ করতে হয় তাকে।
স্থানীয়রা জানান, শফিকুল একা একা বিড়বিড় করে কথা বলেন। কেউ কাছে গেলে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। শিকল খুলে দেওয়ার আকুতি জানালেও পরিবারের সদস্যরা ভয় পান। তাদের আশঙ্কা, শিকল খুলে দিলে তিনি হারিয়ে যেতে পারেন কিংবা কারও ক্ষতি করতে পারেন।
সপ্তাহে একদিন বড় ছেলে মাহবুবুর রহমান বাবাকে গোসল করান এবং বারান্দার মলমূত্র পরিষ্কার করেন। বড় ছেলে ছাড়া অন্য কেউ তার কাছে গেলে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। স্ত্রী মালেকা বেগমকে দেখলেও অনেক সময় রেগে যান বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।
পেটে ক্ষুধা লাগলে চিৎকার করেন শফিকুল। তখন বড় ছেলে খাবার দিলে নীরবে খেয়ে নেন তিনি। নেই মশারি, মশার কয়েল, ভালো বিছানা কিংবা ফ্যান। শীত, কুয়াশা, রোদ, বৃষ্টি ও ঝড়—সব প্রতিকূলতা সয়েই দিন কাটছে তার।
শফিকুলের এক বাল্যবন্ধু নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কিশোর ও যৌবনে শফিকুল খুব পরিশ্রমী ও সাহসী ছিলেন। ৪০ বছর আগে হঠাৎ কী হলো, মানসিক ভারসাম্য হারালেন। পরে মানুষের ক্ষতি করার প্রবণতা দেখা দিলে পরিবার তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে। তার জমি থাকলেও চিকিৎসার জন্য তা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, পরিবারে সুখ-শান্তি না থাকলে মানুষের মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব পড়ে। কঠোর পরিশ্রম করে সম্পদ করলেও সেই সম্পদ তার চিকিৎসায় কাজে লাগছে না। তাকে দেখে খুব কষ্ট হয়।
শফিকুলের স্ত্রী মালেকা বেগম বলেন, প্রায় ৩৮-৪০ বছর আগে হঠাৎ তার মাথায় সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমে কবিরাজের চিকিৎসা করেছি। পরে জমি বন্ধক রেখে রংপুর ও পাবনায় চিকিৎসা করানো হলেও কোনো উন্নতি হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে শিকলে বেঁধে রেখেছি।
তিনি বলেন, ক্ষুধা লাগলে চিৎকার করে, তখন বড় ছেলে খাবার দেয়। মাঝে মাঝে গোসল করানো হয়। জায়গাটি অপরিষ্কার হয়ে গেলে বড় ছেলেই পরিষ্কার করে। আমি বা অন্য কেউ গেলে ক্ষতি করতে তেড়ে আসে। মশারি, কয়েল বা ফ্যান দিলে ভেঙে ফেলে। স্বামীর কষ্ট দেখে খারাপ লাগে, কিন্তু বাড়িতে রাখার মতো পরিস্থিতি নেই।
শফিকুলের বড় মেয়ে ইউপি সদস্য রেহানা বেগম বলেন, আমার জন্মের পাঁচ বছর পর বাবা মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। তখন থেকেই তিনি শিকলবন্দি। ঘরে রাখলে ঘর নষ্ট করেন, মশারি বা গরম কাপড় দিলেও ছিঁড়ে ফেলেন। তাই বারান্দায় রাখা হয়েছে। জমি থাকলেও বিক্রি করতে না পারায় টাকার অভাবে চিকিৎসা চালানো সম্ভব হয়নি।
চন্দ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আমির হামজা বলেন, জন্মের পর থেকে দেখে আসছি তিনি শিকলবন্দি। ছেড়ে দিলে হারিয়ে যান বলে পরিবার তাকে বেঁধে রাখে। বিষয়টি অমানবিক হলেও পরিবারেরও অসহায়ত্ব রয়েছে। তবে উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সুস্থ করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

