ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬

সীমান্তঘেঁষা কেন্দ্রে ভোগান্তির আশঙ্কা: পরিদর্শন ছাড়াই কেন্দ্র নির্ধারণ সিলেট বোর্ডের

জুড়ী (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ০৮:৩১ পিএম
ছবি- সংগৃহীত

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র ও ভেন্যু চূড়ান্ত করেছে সিলেট শিক্ষা বোর্ড। নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্র নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বাধ্যতামূলক হলেও বোর্ডের প্রতিনিধিরা সেই নিয়ম উপেক্ষা করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা। এই অবহেলার ফলে একদিকে ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ১-২ কিলোমিটার দূরের দুর্গম কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা, অন্যদিকে সহজলভ্য ও অবকাঠামোগতভাবে উপযুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয় কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই বাতিল করা হয়েছে। উপজেলার একাডেমিক সুপারভাইজার নিজেও স্বীকার করেছেন, এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় পর্যায়ের মতামত নেওয়া হয়নি।

সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়া কেন্দ্র নির্ধারণের কারণে যেমন শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তেমনি গত বছরের সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু বাদ দেওয়াকে ঘিরেও বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে এবং ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ১ থেকে ২ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত রাঘনা বটুলী উচ্চ বিদ্যালয়কে এবার এসএসসি পরীক্ষার একটি কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই কেন্দ্রের অধীনে প্রথমে সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয় ও ফুলতলা বশির উল্লা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও পরে শিক্ষা বোর্ড সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফুলতলা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীরা অংশ নেবে। আর ফুলতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের নিজ বিদ্যালয় থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয়ের পুরাতন ভেন্যুতে পরীক্ষা না দিয়ে সীমান্তবর্তী প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরের রাঘনা বটুলী উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় নিয়মিত যানবাহন চলাচল না থাকায় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার দিন ব্যক্তিগত বা রিজার্ভ গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হবে, যা অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

শুধু যাতায়াত নয়, প্রশ্নপত্র পরিবহন নিয়েও রয়েছে গুরুতর উদ্বেগ। উপজেলা সদর থেকে এত দূরে কেন্দ্র হওয়ায় থানা থেকে প্রশ্নপত্র পৌঁছাতে দেরি হওয়ার ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। ২০২০ সালে পরীক্ষা শুরুর ৫ থেকে ১০ মিনিট পর প্রশ্নপত্র কেন্দ্রে পৌঁছানোর অভিযোগে এক শিক্ষার্থী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছিলেন। একই সমস্যার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কায় এবারও অভিভাবক ও শিক্ষক মহলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে ফুলতলা ইউনিয়নে রাঘনা বটুলী উচ্চ বিদ্যালয় ও ফুলতলা বশির উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়কে কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করায় জনমনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একই ইউনিয়নের মাত্র ৩ কিলোমিটারের মধ্যে দুটি পৃথক পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের এই সিদ্ধান্তকে অপরিকল্পিত ও অযৌক্তিক বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। সাধারণত একটি কেন্দ্রে একাধিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একত্রে পরীক্ষায় অংশ নেন এটাই প্রচলিত নিয়ম ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনা। অথচ এখানে এত কাছাকাছি দুটি কেন্দ্র রাখা হয়েছে, যা জনবল, নজরদারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার দিক থেকে সম্পদের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয় বলে মত দিচ্ছেন সচেতন মহল। তাদের বক্তব্য, দুটি কেন্দ্রের পরিবর্তে একটি সুসংহত ও সুবিধাজনক কেন্দ্র রাখলে পরীক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ হতো, প্রশ্নপত্র সরবরাহেও ঝুঁকি কমত এবং সামগ্রিক পরীক্ষা ব্যবস্থাপনাও অনেক বেশি সুশৃঙ্খল হতো। সিলেট শিক্ষা বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত তাই স্থানীয় ভৌগোলিক বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসী।

সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয়ের ভেন্যু বাতিলের সিদ্ধান্তকে ঘিরে। গত বছর মক্তদির বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয় উভয়ই ভেন্যু হিসেবে সক্রিয় ছিল। কিন্তু চলতি বছর সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয়ের ভেন্যু বাদ দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয়দের কাছে অযৌক্তিক ও বিতর্কিত বলে বিবেচিত হচ্ছে। তারা সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয় ভেন্যু পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন। এই বিদ্যালয়টি জুড়ী-ফুলতলা সড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ এবং বাস সার্ভিসও চালু রয়েছে। সাগরনালকে কেন্দ্র করা হলে ফুলতলার শিক্ষার্থীরা মাত্র দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারত এবং উপজেলা সদর থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রশ্নপত্র পৌঁছে দেওয়াও সম্ভব হতো।

সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা আক্তার জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টি সুনামের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে এবং এখানে পর্যাপ্ত কক্ষ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরীক্ষার উপযোগী পরিবেশ রয়েছে। তিনি বলেন, দূরে পরীক্ষাকেন্দ্র নির্ধারণের ফলে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের যাতায়াতসহ নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থে সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয়কে এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র ঘোষণা না করা গেলেও অন্তত ভেন্যু হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

মক্তদির বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসহাক আলী জানান, তিনি তার বিদ্যালয়ে পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের জন্য শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে আবেদন করেছিলেন। প্রথমে আবেদনটি বাতিল করা হলেও পরবর্তীতে তার বিদ্যালয়কে ভেন্যু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

জুড়ীর একাডেমিক সুপারভাইজার তাহমিনা চৌধুরী বলেন, এটি শিক্ষা বোর্ড থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের মতামত দেওয়ার সুযোগ ছিল না।