ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

চার লাখ নিয়ে চাকরি না দিতে পারায় এক লাখ ফেরত দিলেন প্রধান শিক্ষক!

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
রোকন উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় রোকন উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোকছেদ আলী চার লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে চাকরি দিতে না পেরে এক লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে পাঁচজনের কাছ থেকে জনপ্রতি চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া দিনের পর দিন কোনো ছুটি না নিয়ে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে তিনি একক আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন। এতে শিক্ষার মান কমে যাওয়া, এসএসসি ফলাফল খারাপ হওয়া এবং শিক্ষার্থী সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিতে নিজের পছন্দের লোকজন অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও রয়েছে। কাউকে না জানিয়ে এডহক কমিটিতে জামায়াতপন্থী তিনজনের নাম দিয়ে সভাপতির নাম প্রস্তাব করা হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। এসব নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

মোকছেদ আলী জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের লাঙ্গলশিমুল গ্রামের রোকন উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি ২০০২ সাল থেকে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আছেন। বিদ্যালয়ে পাঁচজন কর্মচারী ও ১২ জন শিক্ষক রয়েছেন।

জানা গেছে, রোকন উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন বিদ্যালয়টি হাফ বিল্ডিং টিনশেডে পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে দুইতলা ভবনে কার্যক্রম শুরু হয়। ২০২২ সালে তিনতলা নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে নিচতলায় অফিস, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় শ্রেণি কার্যক্রম চলছে।

মঙ্গলবার (১৯ মে) সরেজমিনে গিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোকছেদ আলীকে পাওয়া যায়নি। অন্যান্য শিক্ষকরা জানান, তিনি আগামী এক মাসের মধ্যে অবসরে যাবেন। গত দুই–তিন মাস ধরে অসুস্থতার কথা বলে সপ্তাহে দুই–তিন দিন ছুটি নিচ্ছেন এবং নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না। হাজিরা খাতা পর্যালোচনায়ও এর সত্যতা পাওয়া গেছে।

বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র ছয়জন শিক্ষার্থী উপস্থিত রয়েছে। ক্লাস নিচ্ছিলেন শিক্ষিকা ঈশিতা শাহজাদ। শিক্ষার্থীর সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন মনে নেই, খাতা দেখে বলতে হবে।’

শিক্ষার্থী মিম আক্তার বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে আজ উপস্থিতি কম। গতকাল সাতজন উপস্থিত ছিল।’

৭ম শ্রেণিতে চারজন, ৮ম শ্রেণিতে চারজন এবং ৯ম শ্রেণিতে সাতজন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। তবে ১০ম শ্রেণির কক্ষ তালাবদ্ধ পাওয়া যায়, কোনো শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল না।

শিক্ষক সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কোচিংনির্ভর হয়ে পড়েছে, তাই তারা স্কুলে আসে না।’ তবে নিয়মিত ক্লাস না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করতে পারেননি তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মাঝে মাঝে মোবাইলে শিক্ষার্থীদের খোঁজ নিই। আগে যেভাবে শিক্ষকরা মনিটরিং করতেন, এখন সেভাবে হয় না।’ বিদ্যালয়ে বর্তমানে মোট শিক্ষার্থী ১৭৬ জন বলে তিনি জানান।

স্থানীয় মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমার মেয়ে আনিকা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। লেখাপড়ার মান খারাপ হওয়ায় অন্য স্কুলে ভর্তি করেছি।’

আরেক অভিভাবক আজিজুল হক বলেন, ‘বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মান একেবারে খারাপ। প্রধান শিক্ষকের একগুঁয়েমির কারণে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে।’

সম্প্রতি হুমায়ুন নামে এক ব্যক্তিকে ল্যাব সহকারী পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আট লাখ টাকার চুক্তি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। চার লাখ টাকা প্রধান শিক্ষককে প্রদান করা হলেও চাকরি না দিয়ে এক লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়। বাকি তিন লাখ টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগীর ভাই কালিমুল্লাহ বলেন, ‘আমার ভাইকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে চার লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে এক লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে, বাকি টাকা এখনও ফেরত দেওয়া হয়নি।’

এডহক কমিটি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক নিজের পছন্দের লোকদের দিয়ে কমিটি গঠনের চেষ্টা করছেন। তবে তিনি তিনজন প্রার্থীর নাম উল্লেখ করেছেন— আব্দুল হক, আব্দুল হাই ও মো. শহিদুল্লাহ।

স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, এসব প্রার্থী জামায়াতপন্থী। এ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, প্রধান শিক্ষক অবসরের আগে নিজের সুবিধা নিশ্চিত করতে পছন্দের লোক দিয়ে কমিটি গঠন করতে চাইছেন।

বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, ‘স্যার একরোখা, নিজের খেয়ালখুশিমতো চলেন। এডহক কমিটিতে কারা আছে, তা আমাদের জানা নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান খুবই খারাপ। গত বছর ৩২ জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই পাস করেছে।’

অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক মোকছেদ আলী বলেন, ‘চাকরির শেষ সময়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ভুঞাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তবে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’