সীমান্তঘেঁষা নীরব ও মনোরম গ্রাম রামনাথপুর। চারপাশে উঁচু-নিচু পাহাড়ি সৌন্দর্য আর আঁকাবাঁকা কাঁচা-পাকা পথের মাঝেই দীর্ঘদিন ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক স্বপ্ন একটি স্থলবন্দর। কিন্তু দেড় যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবতার মুখ দেখেনি।
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার সীমান্তবর্তী রামনাথপুর এলাকায় প্রস্তাবিত স্থলবন্দর প্রকল্পটি প্রায় ১৭ বছর ধরে কেবল আলোচনা, চিঠি চালাচালি ও নথিপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে হতাশা ও ক্ষোভ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে এই সীমান্ত জনপদে স্থলবন্দর ঘিরে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখেছিলেন এলাকাবাসী। ওই সময় রামনাথপুর আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লি. উদ্যোগ নেয়।
বৈধ বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের আশায় তারা আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার ঘন আবরণে ঢাকা পড়ে গেছে।
স্থানীয় আদিবাসী ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থলবন্দর চালু হলে এই সীমান্ত এলাকায় বৈধ বাণিজ্যের নতুন দ্বার উন্মোচিত হতো। পরিবহন, গুদামজাতকরণ, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো, যা পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারত।
তবে স্থলবন্দর না থাকায় অতীতে সীমান্ত এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য ও চোরাচালানের প্রবণতা তৈরি হয়েছিল বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে এসব কার্যক্রমে প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততাও ছিল। সীমান্তনির্ভর ছোটখাটো কাজ, শ্রম ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষ এখন বিকল্প আয়ের অভাবে কঠিন সময় পার করছেন।
বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত টহলের কারণে সীমান্তে অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে চোরাচালানের পণ্যও জব্দ করা হচ্ছে।
রামনাথপুর গ্রামের আদিবাসী বাসিন্দা মতিশ ম্রং বলেন, স্থলবন্দর চালু হলে বৈধ বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হতো এবং কর্মসংস্থান বাড়ত। পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রমও কমে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হতো।
এ বিষয়ে রামনাথপুর আমদানি-রপ্তানিকারক (অভ্যন্তরীণ) ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহাব বলেন, “সীমান্তের মানুষের কথা চিন্তা করে স্থলবন্দরের আশায় আমরা ১৭ বছর ধরে দৌড়ঝাঁপ করছি। বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেছি। ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কী কারণে অগ্রগতি হচ্ছে না, তা আমরা এখনো জানি না।”
তিনি আরও বলেন, সব মিলিয়ে রামনাথপুর সীমান্ত এখন এক পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একদিকে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ঝুলে থাকা স্থলবন্দর প্রকল্প, অন্যদিকে জীবিকার অনিশ্চিত বর্তমান।
তবে স্থানীয়দের একটাই প্রত্যাশা, দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই করে সরকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়া হোক, যাতে সীমান্ত এলাকায় উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
এ বিষয়ে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. মিকাইল ইসলাম বলেন, “রামনাথপুর স্থলবন্দর বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক দিকগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।”


