মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটে সেলফি পরিবহন থেকে শ্রমিকের নাম ভাঙিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা এবং মাসে ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্রের বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে গিয়ে সেলফি পরিবহন কাউন্টারের সামনে দেখা যায়, দুইজন কর্মরত রয়েছেন—একজন কাউন্টারের বাইরে, আরেকজন ভিতরে। সেখানে আর কোনো পরিবহন সেক্টরের স্টাফ ছিল না। কাউন্টার থেকে তোফাজ্জল হোসেন বলেন, প্রতিদিন ভোর পাঁচটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত পাঁচ মিনিট অন্তর পাটুরিয়া ঘাট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখানে গড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৮০ থেকে ১৯০টি গাড়ি। প্রতিটি গাড়ি থেকে ২৫০ টাকা করে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫০ টাকা পার্কিং বাবদ নেওয়া হয়, আর বাকি টাকা সুলতানের হাতে বুঝিয়ে দেন।
তিনি আরও বলেন, দুই দিন পরপর এক দিন ডিউটি। মাসিক বেতনের মাধ্যমে এখানে আমরা কাজ করে থাকি। এর বাইরে আর আমি কিছু জানি না।
এ বিষয়ে সেলফি পরিবহনের সুপারভাইজার সুলতান বলেন, প্রতিটি গাড়ি থেকে ২৫০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫০ টাকা পার্কিংয়ে যায়, আর বাকি টাকা আমাদের ১৮–২০ জন কর্মচারীর বেতন বাবদ নেওয়া হয়। অবশিষ্ট টাকা রোডের খরচ ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের দেওয়া হয়। শিবালয় থানার ওসি সাহেব বিষয়টি অবগত আছেন।
স্থানীয় সচেতন মহল সূত্র জানায়, এ দেশের পরিবহন খাত দীর্ঘকাল ধরেই এক অদৃশ্য, অথচ অতি শক্তিশালী চাঁদাবাজচক্রের জালে বন্দি। ভয়াবহ এই পরিসংখ্যান কেবল একটি খাতের বিশৃঙ্খলা নয়; বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর এক বিশাল বোঝা। যখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কেউ এই লুণ্ঠনপ্রক্রিয়াকে ‘অলিখিত বিধি’ বা ‘কল্যাণমূলক ব্যয়’ হিসেবে অভিহিত করেন, তখন সরষের মধ্যেই ভূতের অস্তিত্ব প্রকট হয়ে ওঠে।
তারা আরও জানান, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির এই মহোৎসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া অপরাধচক্র। মালিক-শ্রমিক সংগঠনের চাঁদা কিংবা নামে-বেনামে যে অর্থ আদায় করা হচ্ছে, তার সিংহভাগই যাচ্ছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু সদস্য এবং নামধারী শ্রমিক নেতাদের পকেটে। ফলে সরকার পরিবর্তন হলেও কেবল চাঁদাবাজির ‘হাতবদল’ হয়, কিন্তু ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটে না। এই চাঁদাবাজির সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। পরিবহন মালিকরা যখন পথে পথে চাঁদা দিতে বাধ্য হন, তখন সেই বাড়তি খরচ উশুল করা হয় যাত্রীদের পকেট থেকে ভাড়া বাড়ানোর মাধ্যমে। অর্থাৎ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের পকেট ভরতে গিয়ে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের প্রশ্রয়মূলক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে কেবল সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কঠোর ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন সচেতন মহল।
পরিবহন খাত একটি দেশের অর্থনীতির ধমনি। সেই ধমনিতে যদি চাঁদাবাজির ক্যানসার বাসা বাঁধে, তবে রাষ্ট্রব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়বে। জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই ‘অলিখিত বিধি’র অবসান এখন সময়ের দাবি। সরকার যদি এই অদৃশ্য জঞ্জাল পরিষ্কার করতে ব্যর্থ হয়, তবে জনরোষের দাবানল থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হবে। মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন আর লুণ্ঠন কখনো হাত ধরাধরি করে চলতে পারে না।
এ বিষয়ে শিবালয় থানার ওসি মো. মনির হোসেন জানান, প্রতিটি সেলফি পরিবহন থেকে তারা কয় টাকা করে নেয়, সে বিষয়ে আমার জানা নেই। যদি মালিকপক্ষ লিখিত অভিযোগ করেন, তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন