দেশের বাজারে তুমুল জনপ্রিয় ফল রাজশাহীর আম। উত্তরাঞ্চলের মানুষের অর্থনীতির মূলচালিকা শক্তি আমের ব্যবসা। তাই প্রতিবছর আমের ভালো উৎপাদনের অপেক্ষায় থাকেন রাজশাহী চাঁপাইনবয়াবগঞ্জের মানুষ। এবারও সেই প্রত্যাশায় রয়েছেন। ইতিমধ্যে আম গাছে মুকুল আসতে শুরু করেছে। সেই মুকুলের মৌ মৌ গন্ধে স্বপ্ন বুনছেন আমচাষী ও ব্যবসায়ীরা। এখন বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
পৌষের শুরু থেকেই রাজশাহী অঞ্চলের আম গাছগুলোতে দেখা মিলছে মুকুলের। নানা ফুলের সঙ্গে সৌরভ ছড়াচ্ছে আমের মুকুলও। এ ছাড়াও শহরের পাশ্ববর্তী অঞ্চলের আম চাষিরা গত বছরের তুলনায় চলতি বছর ভালো ফলনের আশা করছেন। বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষিবিদরাও।
তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত আবহাওয়া আম চাষের অনুকূলে রয়েছে। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এ বছর আমের বাম্পার ফলন হবে। এবার গত বছরের চেয়ে ৪১৮ হেক্টর জমিতে আমের বাগান কমেছে। পাশাপাশি আমের উৎপাদন লক্ষমাত্রা কমেছে ৩ হাজার ৯৫২ মেট্রিক টন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যনুযায়ী, রাজশাহীতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমের আবাদ হয়েছিল ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে পাশাপাশি আমের উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন।
আমচাষিরা বলছেন, গতবছরের তুলনায় অনেক বাগান উজাড় হয়েছে পাশাপাশি আম গাছের সংখ্যাও কমেছে। গত বছর শিলাবৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে রাজশাহীতে আমের ফলন কম হয়েছিল। কিন্তু এইবছর আমের ভালো ফলনের আশায় আছেন তারা।বাগানে ইতিমধ্যে গাছে মুকুল চলে এসেছে। ঘন কুয়াশা থাকলেও শীতের তীব্রতা কম হওয়ায় মুকুলের তেমন ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজশাহীর কয়েকটি উপজেলায় আমচাষিরা গাছে গাছে কীটনাশক মিশ্রিত পানি স্প্রে করছেন। পাশাপাশি গাছের বাড়তি যত্ন নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গত কয়েকদিনের কুয়াশার কারণে মুকুলকে ছত্রাকের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে ছত্রাকনাশক স্প্রে ব্যবহার করছেন তারা।
পবা উপজেলার আমচাষি রফিক হোসেন জানান, এ বছরের আবহাওয়া আমের জন্য অনুকূলে রয়েছে। গত বছরের চেয়ে টানা শীত ও কুয়াশার তীব্রতা এ বছর অনেক কম। গতবারের মতো মৌসুমের শুরুতে শিলাবৃষ্টিও হয়নি। এরই মধ্যে অনেক গাছে মুকুল আসতে শুরু করেছে।
আমচাষি সানজিদা রহমান জানান, বছর জুড়ে গাছের পরিচর্যা করার কারণে এখন প্রতি বছরই আমের ভালো ফলন পাওয়া যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শে গাছে মুকুল আসার সময় ভালোভাবে স্প্রে করে দেওয়া হয়েছে। এতে গাছে বাস করা হপার বা শোষকজাতীয় পোকাসহ অন্যান্য পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। যদি সঠিক সময়ে হপার বা শোষক পোকা দমন করা না যায় তাহলে আমের ফলন কমে যেত বলে জানান এই আমচাষি।
দূর্গাপুর উপজেলার আমচাষি শাহাজামাল বলেন, ‘আমরা বছরজুড়েই গাছের যত্ন নেই। আমের বাণিজ্যিক চাষের জন্য আমাদের অগ্রীম পরিকল্পনা থাকে। তবে গাছে কেবলমাত্র মুকুল আসা শুরু হয়েছে। আমরা এখন গাছে গাছে স্প্রে দিচ্ছি। আশা করছি আমের উৎপাদন ভালো হবে।’
চাষিরা আরো জানিয়েছে, এবছর শীতের তীব্রতা তুলনামূলক কম হলেও সময়মতো ঠান্ডা পড়ায় মুকুল গজাতে সহায়ক হচ্ছে। পাশাপাশি কুয়াশা ও অতিবৃষ্টির প্রভাব কম থাকায় মুকুল ঝরে পড়ার আশঙ্কাও কম। অনেক বাগানে ইতোমধ্যে মুকুল থেকে গুটি ধরতে শুরু হয়েছে।
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাজশাহীর আম বাগানগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত মুকুল আসেনি। ফেব্রুয়ারি মার্চের দিকে পরিপূর্ণ মুকুল আসবে। এখন থেকে গাছের ভালো যত্ন নিলে এবং গাছের রোগবালাই দমনে কাজ করলে ভালো মুকুল আসবে। তবে গতবারের তুলনায় এইবারের আবহাওয়া ভালো থাকায় আশা করছি গাছে ভালো পরিমাণ আম আসবে।’
রোগবালাই দমনে আমচাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাসির উদ্দিন জানান, মাঠপর্যায়ে আমের ভালো উৎপাদনের লক্ষ্যে আমরা চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। আমেরা ভালো উৎপাদনের লক্ষ্যে একটি গাছে বছরে দুইবার কীটনাশক দিতে হয়। মাঠ পর্যায়ে আমাদের সহকারী ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
তিনি আরও জানান, গতবছর রাজশাহীতে হেক্টর প্রতি আমের উৎপাদন হয়েছিল ১২ দশমিক সাড়ে ৭ এবং চলতি বছরে আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৮ হেক্টর। সে অনুযায়ী আমের উৎপাদন এবছর ভালোই হবে।



