ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

রুয়েট শিক্ষকের তৈরি জ্বালানি সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক গাড়ি চলছে ক্যাম্পাসে

রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশিত: এপ্রিল ৯, ২০২৬, ০৪:১৬ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) ক্যাম্পাসে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এবং ছাত্রীদের যাতায়াতকে সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী করতে চালু হয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. আব্দুর রাজ্জাক আনুষ্ঠানিকভাবে এ সেবার উদ্বোধন করেন। নতুন এই উদ্যোগকে ক্যাম্পাসে টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া বর্তমান সংকট মোকাবিলায় এই গাড়ি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে কাজ দেবে বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের উদ্যোগে এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর অর্থায়নে একটি গবেষণা প্রকল্পের আওতায় গাড়িটি তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পটির নেতৃত্ব দেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শাহজাদা মাহমুদুল হাসান। পরিকল্পনা, নকশা প্রণয়ন, যন্ত্রাংশ সংযোজন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত নির্মাণ— সবকিছুই সম্পন্ন হয়েছে রুয়েটের নিজস্ব প্রযুক্তি ও জনবল ব্যবহার করে। ফলে এটি শুধু একটি পরিবহন মাধ্যম নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী দক্ষতার একটি বাস্তব প্রতিফলন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে ক্যাম্পাসে চলাচলকারী কিছু ডিজেলচালিত বাসের ট্রিপ কমিয়ে দেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন যাতায়াতে ভোগান্তি বেড়ে যায়। বিশেষ করে ছাত্রীদের জন্য বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ তাদের আবাসিক হলগুলো একাডেমিক ভবন থেকে তুলনামূলকভাবে দূরে অবস্থিত। এই বাস্তব সমস্যাকে সামনে রেখে রুয়েটের গবেষক দল কম খরচে পরিচালনাযোগ্য, পরিবেশবান্ধব এবং জ্বালানিনির্ভরতা কম এমন একটি বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা উদ্ভাবনের উদ্যোগ নেয়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, গাড়িটি নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা, যা বাজারে প্রচলিত বৈদ্যুতিক যানবাহনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ১২ আসনের এই গাড়িটি নির্ধারিত রুটে প্রতি ২০ মিনিট পরপর চলাচল করবে এবং ছাত্রীদের আবাসিক হল থেকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পৌঁছে দেবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সেবা ব্যবহারের জন্য ছাত্রীদের কোনো ভাড়া দিতে হবে না, যা তাদের আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি মানসিক স্বস্তিও দেবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধানই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের ফলে জ্বালানি খরচ কমবে, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে এবং ক্যাম্পাসে শব্দদূষণও কমবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানান, এই উদ্যোগ দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও একটি কার্যকর মডেল হতে পারে। সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে কীভাবে গবেষণাভিত্তিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাস্তব সমস্যার সমাধান করা যায় রুয়েটের এই বৈদ্যুতিক গাড়ি তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এ ছাড়া, ছাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই উদ্যোগটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও উদ্ভাবনের ব্যবহারিক প্রয়োগের গুরুত্বকেও নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্যাম্পাসগুলো ধীরে ধীরে আরও স্মার্ট, টেকসই ও শিক্ষাবান্ধব হয়ে উঠবে।

প্রকল্পের প্রধান অধ্যাপক শাহজাদা মাহমুদুল হাসান জানান, ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা আউটকাম-বেসড এডুকেশন (ওবিই)-এর লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি বাস্তব সমস্যার একটি টেকসই সমাধান দিতে পেরেছি। কারণ ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের আবাসিক হলগুলো একাডেমিক ভবন থেকে দূরে হওয়ায় এই সেবাটি তাদের জন্য অত্যন্ত উপকারী হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও গাড়ি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। রুট পারমিট পাওয়া গেলে এই গাড়ি ক্যাম্পাসের বাইরেও চালানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বাইরে থেকে গাড়ি ক্রয় না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাত থেকেই এটি তৈরি করা হয়েছে, যা একদিকে ব্যয় সাশ্রয় করেছে, অন্যদিকে গবেষণাকে উৎসাহিত করেছে।’