ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

ফুটন্ত তেলের কড়াই আর স্বপ্নের আগুন—জাব্বারের জীবনসংগ্রামের গল্প

রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশিত: জুন ২৭, ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

টগবগে ফুটন্ত তেলের কড়াই। যেখানে সাধারণ মানুষ কাছে যেতেও ভয় পান, সেখানে খালি হাতেই পেঁয়াজু, বেগুনি আর আলুর চপ তুলে নিচ্ছে এক কিশোর। দৃশ্যটি দেখে বিস্মিত হন পথচারীরা। কেউ ভিডিও করেন, কেউ দাঁড়িয়ে দেখেন। তবে আব্দুল জাব্বারের কাছে এটি কোনো কৌশল নয়—এটাই তার প্রতিদিনের জীবন, সংসার চালানোর সংগ্রাম আর স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আমোদপুর গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী আব্দুল জাব্বার বাবার ছোট্ট ভাজাপোড়ার দোকানে কাজ করে পরিবারের হাল ধরেছেন। প্রতিদিন বিকেলে গ্রামের জামে মসজিদ মোড়ের দোকানে গরম তেলের কড়াইয়ে একের পর এক পেঁয়াজু, বেগুনি ও আলুর চপ ভেজে খালি হাতেই তুলে রাখেন বিক্রির জন্য। এই ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখতে এবং তার দোকানের খাবারের স্বাদ নিতে প্রতিদিনই ভিড় করেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ।

জাব্বারের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস এই দোকান। সংসারের খরচের পাশাপাশি তার পড়াশোনার ব্যয়ও এখান থেকেই মেটানো হয়।

তার এই সংগ্রামে সবচেয়ে বড় সহযোদ্ধা মা মুঞ্জুরা বেগম। ভোর থেকেই তিনি দোকানের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেন। আর দোকানে ক্রেতা সামলাতে সাহায্য করেন জাব্বারের বন্ধু কিরণ, তামিম ও আসিফ।

জাব্বারের বাবা বাবুল ইসলামও এলাকায় পরিচিত একজন সমাজসেবক। প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে গ্রামের মানুষের কবর খুঁড়ে আসছেন। মৃত্যুর খবর পেলেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে ছুটে যান কবরস্থানে। বর্তমানে এই মানবিক কাজে বাবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন জাব্বারও।

বাবুল ইসলাম বলেন, ধর্মীয় দায়িত্ববোধ থেকেই এই কাজ শুরু করেছিলাম। চাই, নতুন প্রজন্মও এই মানবিক দায়িত্ব পালন করুক।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কবর খোঁড়া থেকে শুরু করে রাতের বেলায় আলোর ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় বাঁশ সংগ্রহ—সব কাজই তারা স্বেচ্ছাশ্রমে করেন। প্রতি রমজানেও গ্রামের মসজিদে ইফতারের আয়োজন করেন নিজেদের উদ্যোগে।

জাব্বারের চাচা ও শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জাব্বারের পরিচয় শুধু ফুটন্ত তেলে হাত দেওয়া নয়। সে দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী ও সমাজসেবায় নিবেদিত একজন তরুণ। তার জীবনসংগ্রাম বর্তমান প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয়।

জাব্বারের গল্প সাহসের চেয়েও বড়—এটি দায়িত্ববোধ, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়ের গল্প। ফুটন্ত তেলের উত্তাপ তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়েই সে গড়ে তুলছে নিজের ভবিষ্যৎ। আমোদপুরের এই কিশোর তাই আজ অনেকের কাছেই সংগ্রাম, মানবিকতা ও স্বপ্নপূরণের এক উজ্জ্বল প্রতীক।