গত এক বছরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন তিনজন শিক্ষার্থী। আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও ক্যাম্পাসে ডেঙ্গু প্রতিরোধে দৃশ্যমান সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অভাব, নিয়মিত প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের ঘাটতি এবং মশার উপদ্রব শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে দুজনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর ছিল না। তবে একজনের অবস্থা জটিল হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়। মেডিকেল সেন্টারের কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ সব শিক্ষার্থী চিকিৎসার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে আসেন না।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ জুন পর্যন্ত চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ৩১৭ জন। এর মধ্যে রাজধানীর বাইরে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ১২৫ জন এবং রাজধানীতে ১ হাজার ১৩০ জন।
শুধু জুন মাসেই শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ১২০ জন রোগী, যা মে মাসের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে জুন মাসেই মারা গেছেন সাতজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে ২৫ জুন আরও দুজনের মৃত্যু এবং ১৫৭ জন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য জানানো হয়েছে। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪ হাজার ৯১৯ জন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রশাসন, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন বা পরিবেশবিষয়ক সংগঠনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো সচেতনতামূলক পোস্টার, ব্যানার কিংবা প্রচারণা নেই। আবাসিক হলের বিভিন্ন কক্ষে ইনডোর প্ল্যান্টের টব, জার ও অন্যান্য পাত্রে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে, যা এডিস মশার প্রজননের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ঝোপঝাড় ও অপরিচ্ছন্ন ড্রেনও মশার উপদ্রব বৃদ্ধির কারণ বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
সুনীতি শান্তি হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ফারজিয়া সুলতানা বলেন, কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর এই ক্যাম্পাসে একজন শিক্ষার্থীও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে পুরো ক্যাম্পাসের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। বর্তমানে মাঝে মাঝে ফগিং করা ছাড়া দৃশ্যমান কোনো বড় উদ্যোগ দেখা যায় না। অথচ শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, হলের চারপাশ ও একাডেমিক ভবনের আশপাশে মশার উপদ্রব বেড়েছে। ঝোপঝাড় ও ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার না করায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস হচ্ছে না। তাই বছরব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ড্রেনে নিয়মিত লার্ভিসাইড স্প্রে এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা জরুরি।
বিজয়-২৪ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ইরফান বলেন, প্রশাসনের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা, নিয়মিত ও পরিকল্পিত মশক নিধন কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি যেসব স্থানে পানি জমে থাকে, সেগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ স্থান সম্পর্কে প্রশাসনকে জানাতে পারে, সে জন্য কার্যকর রিপোর্টিং ব্যবস্থাও চালু করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট শাখার সহকারী রেজিস্ট্রার রেজাউল কবির বলেন, আমরা ক্যাম্পাসের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে নিয়মিত কাজ করছি। প্রতিটি হলে তিনজন করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে আলাদাভাবে কোনো লার্ভিসাইড স্প্রে করা হয় না। তবে মশক নিধনের জন্য প্রতি সপ্তাহে একবার স্প্রে করা হয়।
তবে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত স্প্রে কার্যক্রম পরিচালনার দাবির পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা নথিপত্র দেখাতে পারেননি তিনি।
কাজী নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রাহিম বলেন, প্রতি সপ্তাহে স্প্রে করা হয়—এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। শেষ কবে হলে স্প্রে করতে দেখেছি, তা মনে করাও কঠিন। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘অভয়ারণ্য’-এর সভাপতি আদনান আলম বলেন, এখনও ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়নি। তবে আগামী মাস থেকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী আমরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের প্রধান চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান খান (সোহাগ) বলেন, চলতি বছরে আমাদের কাছে ডেঙ্গু আক্রান্ত তিনজন শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর ছিল না। তবে একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে কক্ষে টব, বালতি বা অন্যান্য পাত্রে যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। কারণ স্থির পানিতে এডিস মশা সহজেই বংশবিস্তার করে। যদিও মেডিকেল সেন্টারের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয় না, তবে চিকিৎসা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীবিষয়ক উপদেষ্টা সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের আরও সচেতন করতে এবং প্রয়োজনীয় প্রচারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় আমরা উদ্যোগ নেব।
এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ নুরুল করিম চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

