রংপুরে দেড় বছর ধরে জিম্মি রেখে এক কিশোরীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে আপন চাচা ও তার বন্ধু। উপর্যুপরি ধর্ষণে সাড়ে ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এখন নবম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর তোলপাড় পুরো এলাকা। লোকলজ্জার ভয়ে এই কিশোরীকে নিয়ে আড়ালে থাকছেন তার অসহায় মা। থানায় মামলা করেও পাচ্ছেন না সুবিচার। একজন আসামি ধরা পড়লেও ১ নম্বর আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়িয়ে মীমাংসার জন্য দিচ্ছে নানা হুমকি। পুলিশ ১ নম্বর আসামিকে না ধরে সময়ক্ষেপণ করছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর।
ঘটনাটি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ভাংনী ইউনিয়নের পাকুরিয়া এলাকার। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিন গিয়ে কথা হয় ভুক্তভোগী কিশোরীর মায়ের সাথে। তিনি জানান, আপন চাচার হাতে তার ধর্ষিতা মেয়ে এখন সাড়ে ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। যেকোনো সময় বাচ্চা প্রসব করবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। আলট্রাসনোগ্রাম করে গর্ভে ছেলেসন্তান এসেছে বলেও জানান চিকিৎসক।
ভুক্তভোগী কিশোরীর মা জানান, তার স্বামী মো. মকলেছুর রহমানের সাথে প্রায় পাঁচ বছর আগে ২০২০ সালের দিকে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এরপর চাকরিসূত্রে ঢাকায় থাকতেন তিনি। বাবা অন্যত্র বিয়ে করায় তার নাবালিকা কন্যা আপন চাচা মো. নাজমুল ইসলামের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছিল। এই সুযোগে ২০২৪ সালের দিকে চাচি বাবার বাড়িতে যাওয়ায় একা পেয়ে আপন ভাতিজিকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে চাচা নাজমুল ইসলাম। এরপর থেকে নানাবিধ ভয়ভীতি দেখিয়ে আপন চাচা দেড় বছর ধরে তার নাবালিকা মেয়েটিকে ধর্ষণ করে আসছে।
ভুক্তভোগী কিশোরীর মা জানান, চাচার এসব অপকর্ম দেখে ফেলায় তার মেয়ের বন্ধু মেহেদী হাসানও সুযোগ গ্রহণ করে। ভয়ভীতি দেখিয়ে সে-ও ধর্ষণ করে। দুজন মিলে দেড় বছর ধরে তার মেয়েকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে আসছে বলে জানান ভুক্তভোগীর অসহায় মা।
গত ৭ আগস্ট ২০২৫ সালে ভুক্তভোগী কিশোরী তার মায়ের সাথে দেখা করতে ঢাকায় যায়। মেয়ের শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ করে জিজ্ঞেস করলে মাকে সবকিছু খুলে বলে কিশোরী। ঘটনা শোনার পর ঢাকায় মেয়েকে ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে প্রেগন্যান্সি পরীক্ষা করালে জানতে পারেন কিশোরী ১৬ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। চলতি মাসের ২১ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে কিশোরী বাচ্চা প্রসব করতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
ভুক্তভোগী কিশোরীও কেঁদে কেঁদে পুরো ঘটনাটি গণমাধ্যমে জানায়। বলে, তার আপন চাচা তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছে। তার চাচার অপকর্ম দেখে ফেলায় তার বন্ধুও তাকে ধর্ষণ করেছে। দেড় বছর ধরে ধর্ষণের শিকার হলেও লোকলজ্জার ভয়ে কাউকে বলতে পারেনি। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর মায়ের কাছে সব বলেছে। তার মা সব জানার পর অক্টোবর মাসের ২০২৫ সালে মিঠাপুকুর থানায় মামলা করে। মামলার দুই নম্বর আসামি বন্ধু মেহেদী হাসানকে পুলিশ ধরলেও আসল অপরাধী এক নম্বর আসামি চাচা নাজমুল ইসলাম এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে জানায় ভুক্তভোগী কিশোরী।
ভুক্তভোগীর মা জানান, প্রধান আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাকে ধরছে না। অর্থের বিনিময়ে পুলিশ আসামিকে ধরতে গাফিলতি করছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর মায়ের। এ অবস্থায় সরকারের কাছে ন্যায়বিচার চান তিনি। একই সাথে তার নাবালিকা মেয়ে ও গর্ভের সন্তানের থাকার নিরাপদ জায়গা চান। ভুক্তভোগীর মা জানান, বাচ্চা প্রসবের পর সমাজ তাদের বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারে। তখন কোথায় যাবেন তারা। এ কারণে সরকারের কাছে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন তারা। সরকারি সহযোগিতা না পেলে আত্মহত্যা করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না তাদের।
নিপীড়নবিরোধী নারীমঞ্চ, রংপুরের আহ্বায়ক বীথি দাস নন্দিনী বলেন, দেশে আইনের প্রয়োগ খুবই দুর্বল হওয়ায় এসব ঘটনা বাড়ছে। তার দাবি নারী সুরক্ষার জন্য শক্তিশালী আইন তৈরি করতে হবে এবং কঠোরভাবে তা প্রয়োগ করতে হবে।
রংপুর মানব পাচার অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সহকারী বিশেষ প্রসিকিউটর মো. হারুন অর রশীদ মনু বলেন, মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। চার্জশিট ও ফরেনসিক রিপোর্ট আসেনি। ফরেনসিক রিপোর্ট এলেই বোঝা যাবে সন্তানের বাবা কে—চাচা, না বন্ধু। বর্তমানে বাদী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ধর্ষক নরপিশাচের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আসামিকে না ধরা ন্যক্কারজনক কাজ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মিঠাপুকুর থানার ওসি মো. নুরুজ্জামান জানান, আসামি গ্রেপ্তারে অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। কোথায় আছে তথ্য দিলেই আসামিকে সঙ্গে সঙ্গে ধরা হবে।
রংপুর সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক অনিল চন্দ্র বর্মণ বলেন, ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রসব করা প্রসূতি ও সন্তানের জন্য উত্তরবঙ্গের মধ্যে রাজশাহীতে রয়েছে সেফ হোম। সেখানে মাসহ এসব সন্তানের থাকার ব্যবস্থা করা হবে।

