এবার ফলন ভালো হলেও মন ভালো নেই চাষিদের। ভরা মৌসুমে আলুর মূল্যধসে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে শুরু হয়েছে পচন। এ পরিস্থিতিতে উপায় না পেয়ে রাস্তায় আলু ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই।
রংপুরের চাষিরা বলছেন, উৎপাদন খরচ কেজি প্রতি ১৩ থেকে ১৫ টাকা হলেও বর্তমানে আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৯ টাকায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিমাগার ভাড়া বৃদ্ধির চাপ। এ কারণে অনেক কৃষক আলু সংরক্ষণ না করে বাড়িতে রেখে দিলেও যার বড় অংশ পচে নষ্ট হচ্ছে। ফলে বর্তমান বাজারে আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তো দূরে থাক, হিমাগার ভাড়া ও পরিবহন খরচ তোলাও দায় হয়ে পড়েছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের চেংমারী গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান জানান, তিনি প্রায় ৩০০ শতক জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। শুরুতে পাইকারেরা তিন-চার টাকা কেজি দর প্রস্তাব করায় তিনি আলু ঘরে তুলে রাখেন। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে আলুতে পচন ধরে। শেষপর্যন্ত প্রায় ৫০ বস্তা আলু ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
বদরগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, গত বছর আলু আবাদ করে ৫০০ বস্তা হিমাগারে রেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত দাম না পাওয়ায় সেই আলু হিমাগার থেকে বের করার সাহস হয়নি। এবারও আলু আবাদ করে ধরাশায়ী হওয়ার পথে।
সম্প্রতি জেলার কাউনিয়া, মিঠাপুকুর, পীরগাছা, পীরগঞ্জ বদরগঞ্জ, গঙ্গাচড়া ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শত শত বস্তাভর্তি পচা আলু রাস্তার ধারে ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও স্তূপ করা আলু থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দাম পড়ে যাওয়ায় বিক্রি করতে না পারায় ও সংরক্ষণের অভাবে এসব আলু পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ফেলে দিচ্ছেন।
ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুরে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আলুর উৎপাদন হয়েছে ১৬ লাখ ৫ হাজার ২৫ মেট্রিক টন, যার গড় উৎপাদন খরচ কেজি প্রতি ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অথচ বর্তমান বাজার মূল্য ৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে কৃষকের লোকসান ৬ থেকে ৮ টাকা। এমন বাস্তবতায় কৃষকের ন্যূনতম কেজিতে ৬ টাকা লোকসান হলে উৎপাদন খরচ অনুযায়ী মোট লোকসান হয় প্রায় ৯৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু মূল্য ধসেই রংপুর অঞ্চলে আলুতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
এই ক্ষতির চিত্র আরও গভীর করে তুলেছে হিমাগার ভাড়া বৃদ্ধির কারণে। এ ছাড়া হারভেস্ট মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঘরে মজুত করা আলুতেও ধরেছে পচন, যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে অনেক কৃষকের লোকসানের মাত্রা গিয়ে দাঁড়িয়েছে উৎপাদন খরচের সমান।

