সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জনসভায় সংঘটিত ভয়াবহ বোমা হামলা ও হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বর্তমান প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছসহ মামলার সব আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরে সিলেট বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় লুৎফুজ্জামান বাবর, আরিফুল হক চৌধুরী ও জি কে গউছসহ সব আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। চূড়ান্ত এ রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ২২ বছর পর সিলেট অঞ্চলের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক সহিংসতার মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার অবসান ঘটল।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ জুন সুনামগঞ্জের দিরাই বাজারে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এক নির্বাচনী জনসভায় আকস্মিকভাবে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে স্থানীয় যুবলীগের এক কর্মী নিহত হন এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ অন্তত ২৯ জন নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হন।
ঘটনার দিনই দিরাই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হেলাল উদ্দিন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০০৮ সালে সিআইডি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানসহ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে প্রথম চার্জশিট দাখিল করে। পরে অধিকতর তদন্তের পর সম্পূরক চার্জশিটে লুৎফুজ্জামান বাবর, আরিফুল হক চৌধুরী ও জি কে গউছকে নতুন আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় মামলার ১২৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। এরপর আসামিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ এবং গত এপ্রিল থেকে কয়েক দফা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর আদালত বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন। আসামিপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাডভোকেট এ টি এম ফয়েজ উদ্দিন, অ্যাডভোকেট মো. শহীদুজ্জামান চৌধুরীসহ জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, ঘটনার মূল এজাহারে এসব রাজনৈতিক নেতার নাম ছিল না। এ ছাড়া সাক্ষ্য দেওয়া ৬৭ জনের কেউই আরিফুল হক চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর কিংবা জি কে গউছের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এবং হয়রানির লক্ষ্যে পরবর্তীতে সম্পূরক চার্জশিটে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আদালত উভয় পক্ষের যুক্তি, জবানবন্দি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মত দেন। ফলে তাদের নির্দোষ সাব্যস্ত করে বেকসুর খালাসের আদেশ দেওয়া হয়।
মামলার অন্যতম আসামি হুজি নেতা মুফতি হান্নানের অন্য একটি মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় এর আগেই এই মামলার কার্যক্রম থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।
রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, শুধু বিএনপির রাজনীতি করার কারণে আমাদের দীর্ঘদিন বিভিন্ন কারাগারে থাকতে হয়েছে। অথচ এ ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। যথাযথ আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি।
লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন, আমাকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলাসহ আরও বিভিন্ন মামলায় জড়ানো হয়। আজ আদালতের রায়ে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
জি কে গউছ বলেন, আদালত স্বাধীনভাবে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আমাদের খালাস দিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে দীর্ঘ সময় আমাদের কারাগারে থাকতে হয়েছে।

