গত ২২ জুন রাত সাড়ে ৯টার দিকে রিখটার স্কেলে ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা কেঁপে ওঠে। এরপর থেকেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে—বাংলাদেশে যদি ৮ বা তার বেশি মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে কী ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে? এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজধানী ঢাকা।
এই প্রতিবেদনে আলোচনা করা হয়েছে, বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকায়, বড় ধরনের ভূমিকম্প অনুভূত হলে কী ঘটতে পারে।
গত বছরের ২২ নভেম্বর একটি ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল কেঁপে ওঠে। ওই ঘটনায় শিশুসহ ১০ জন নিহত এবং ছয় শতাধিক মানুষ আহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশ কয়েকটি ভবন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫।
কেন হয় ভূমিকম্প?
প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর ভূখণ্ড একত্রিত ছিল। পরবর্তীতে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে ভূগর্ভস্থ শৈলস্তরে ফাটল সৃষ্টি হয় এবং বিশাল ভূখণ্ড বিভিন্ন প্লেটে বিভক্ত হয়ে ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করে।
বর্তমানে পৃথিবীর ভূত্বকে সাতটি বড়, ১৫টি মাঝারি এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র টেকটোনিক প্লেট রয়েছে। দুটি প্লেটের সংযোগস্থলকে বলা হয় ফল্ট বা ফল্ট লাইন। এসব স্থানে প্লেটগুলোর সংঘর্ষ, চাপ ও সঞ্চিত শক্তির মুক্তির ফলেই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ
বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ তুরস্কের মতো বাংলাদেশও কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের প্রভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম ডাউকি ফল্ট। এর পশ্চিম প্রান্তে বাংলাদেশের অবস্থান। ভারত থেকে বিস্তৃত এই ফল্ট বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত।
ডাউকি ফল্ট ছাড়াও রয়েছে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ মধুপুর ফল্ট, যা জামালপুর থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে দক্ষিণ মিয়ানমার হয়ে আন্দামান সাগর পর্যন্ত আরেকটি সক্রিয় ফল্ট লাইন বিস্তৃত রয়েছে।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ফল্ট লাইন এখনো সক্রিয় এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের উৎস হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ডাউকি ফল্ট
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাউকি ফল্ট বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। সিলেটের জৈন্তাপুর অঞ্চলকে সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্পের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টের পূর্বাংশে রিখটার স্কেলে ৮.৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। তবে পশ্চিমাংশে, বিশেষ করে সুনামগঞ্জ-সংলগ্ন এলাকায়, গত প্রায় ৪০০ বছরে বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্পের রেকর্ড নেই।
গবেষকদের মতে, ডাউকি ফল্টে প্রতি ১০০ বছরে প্রায় এক মিটার করে চাপ জমা হচ্ছে। ফলে গত ৫০০ থেকে ৬০০ বছরে সেখানে ৫ থেকে ৬ মিটার পর্যন্ত শক্তি সঞ্চিত হয়ে থাকতে পারে। এই শক্তি একবারে মুক্তি পেলে ৭.৮ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বড় ভূমিকম্পে ঢাকার কী হতে পারে?
সিলেট বা চট্টগ্রাম অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে শুধু ওই এলাকাগুলোই নয়, রাজধানী ঢাকাও মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
যদিও ঢাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন বড় ভূমিকম্পের উৎস হওয়ার মতো নয়, তবে ডাউকি ফল্ট থেকে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় রাজধানী শক্তিশালী কম্পন অনুভব করবে।
বাংলাদেশ সরকারের কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম (সিডিএমপি) এবং বুয়েটের ২০২৩ সালের এক যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকায় ৭২ হাজারেরও বেশি ভবন ধসে পড়তে পারে। এতে প্রায় ৭ কোটি টন কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বুয়েটের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে যথাক্রমে প্রায় ১৩ লাখ, ৩ লাখ এবং ১ লাখ বহুতল ভবন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ ভবন ছয়তলা বা তার বেশি উচ্চতার। অধিকাংশ ভবনই ৭ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল নয়।
আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন
জাতিসংঘের ভূমিকম্প দুর্যোগ ঝুঁকি সূচক অনুযায়ী, প্রবল ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের ২০টি শহরের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ প্রস্তুতি, ভূমিকম্প-সহনশীল নির্মাণব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না হলে বড় ধরনের ভূমিকম্প দেশের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

