অনিশ্চয়তার শেকলে আটকে যাওয়া অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৬-এর দিনক্ষণ এরই মধ্যে চূড়ান্ত করেছে বাংলা একাডেমি। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ প্রকাশকদের ঈদ-পরবর্তী সময়ে মেলা আয়োজনের দাবির প্রেক্ষিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ একাধিক কারণ তুলে ধরে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারিকে অমর একুশে গ্রন্থমেলার চূড়ান্ত শুরুর তারিখ হিসেবে ঘোষণা দেয়।
তবে বাংলা একাডেমির এই ঘোষণা মেনে নিতে পারেননি লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের একটি বড় অংশ। ঘোষণার পরপরই প্রকাশকদের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। তারা বলেন, ‘শত শত প্রকাশকের প্রাণের দাবি ও অস্তিত্বের সংকটকে উপেক্ষা করে একতরফাভাবে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ শুরুর যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, আমরা সৃজনশীল প্রকাশকরা তাতে গভীর বিস্ময় ও চরম হতাশা প্রকাশ করছি।’ একই সঙ্গে অনেক প্রকাশকই মেলায় অংশগ্রহণ না করার ঘোষণাও দেন।
প্রকাশকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এরই মধ্যে ৩২টি প্যাভিলিয়ন ও ১৫২টি স্টলের প্রকাশক লিখিতভাবে ২০ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর বইমেলা আয়োজনের পক্ষে সম্মতি দিয়েছেন। তাদের দাবি, এই বিশাল অংশকে বাদ দিয়ে মেলা আয়োজন করা হলে তা ইতিহাসের অন্যতম ব্যর্থ ও কলঙ্কিত আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হবে। এ কারণে প্রকাশকরা সরকারের উচ্চপর্যায় এবং বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের কাছে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
এদিকে শুধু প্রকাশক নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রোজার মধ্যে বইমেলা আয়োজন নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ‘রূপালী প্রতিবেদন’-এর করা এক ফেসবুক পোস্টে ‘রোজার মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য বইমেলা নিয়ে আপনার মতামত কী?’এই প্রশ্নের জবাবে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনসহ অসংখ্য লেখক, প্রকাশক ও পাঠক রোজার মধ্যে বইমেলা আয়োজন না করার পক্ষে মত দেন।
এ অবস্থায় গতকাল সাধারণ প্রকাশকদের পক্ষ থেকে দেশের ১২ জন প্রকাশক গণমাধ্যমে একটি পৃথক বিবৃতি পাঠান। বিবৃতিতে ২০ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া বইমেলাকে ‘ভূতুড়ে মেলা’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়, রোজার দিনে বইমেলা শুরু হলে পাঠক ও দর্শনার্থীরা মেলায় আসবেন না,এটাই ধ্রুব সত্য। পাঠক ও ক্রেতা ছাড়া বইমেলা একটি নিষ্প্রাণ সরকারি আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই হবে না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দেশের সৃজনশীল প্রকাশনাশিল্পের অধিকাংশ অংশীজনের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী, অগণতান্ত্রিক ও বাস্তবতাবিবর্জিত। তাই প্রকাশকরা তাদের পূর্বঘোষিত অবস্থানে অনড় থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
এ বিষয়ে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ থেকে বাংলা একাডেমির সচিব ও অমর একুশে গ্রন্থমেলা কমিটির সদস্যসচিব ড. মো. সেলিম রেজার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘বইমেলার সময়সূচি পুনর্বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। পুনর্বিবেচনা করলে এ বছর মেলা করা যাবে না–এটাই বাস্তবতা। কারণ পুনর্বিবেচনা করতে গেলে মেলা শুরু করতে হবে এপ্রিলে, আর ওই সময়ে বাংলাদেশের আবহাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মেলা আয়োজন করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া আগামী পাঁচ-ছয় বছর কখনো পুরোটা, কখনো আংশিকভাবে রোজার সঙ্গে বইমেলা মিলবে। তাই রোজার কারণে মেলা করা যাবে না–এমন ভাবনা থাকলে আগামী কয়েক বছর বইমেলা আয়োজনই করা যাবে না।’
যোগ করে তিনি আরও বলেন, ‘প্রকাশকরা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়ার পর আমাদের মিটিং হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে নতুন করে ভাবার কোনো সুযোগ নেই। আমরা এখনো আশাবাদী যে প্রকাশকরা শেষ পর্যন্ত মেলায় আসবেন। কারণ বইমেলা শুধু বাণিজ্যিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি জড়িত। সেই জায়গা থেকে মেলা করা আমাদের সবারই নৈতিক দায়িত্ব।’
প্রকাশকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বিনীতভাবে অনুরোধ জানাব–আপনারা মেলায় আসুন, আমরা সবাই মিলে একটি সুন্দর বইমেলা করি।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন