ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত, রিজার্ভে বাড়ছে শক্তি

সামজীদ হোসেন
প্রকাশিত: মার্চ ২২, ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম তিন সপ্তাহেই প্রবাসীরা বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ পথে টাকা পাঠাতে সরকারের প্রণোদনা, ব্যাংকিং সেবার উন্নয়ন এবং হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোর নজরদারির ফলে এই প্রবৃদ্ধি এসেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকে বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে পরিবারের খরচ মেটাতে পাঠানো অর্থের পরিমাণও বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারা বজায় থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় ও ডলারের চাপ কিছুটা কমবে। তবে তারা রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল রাখতে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখনো শীর্ষে রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমানে কর্মরত বাংলাদেশিরা নিয়মিতভাবে দেশে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব দেশে নির্মাণ, সেবা ও গৃহস্থালি খাতে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারকে শক্তিশালী করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। প্রবাসীরা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে আগ্রহী হওয়ায় এই প্রবাহ আরও বাড়ছে। সামনে ঈদকে কেন্দ্র করে পরিবার-পরিজনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাঠানোর প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি সংবাদ সংস্থা বাসসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম ২৮ দিনে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৫০ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে প্রবাসীরা ২ হাজার ৯৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন।

গত বছর একই সময়ে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল ১ হাজার ৯৫৫ মিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ১৯ হাজার ২০৯ মিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৫ হাজার ৭৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফেব্রুয়ারিতে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৭৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। আর গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২২৮ কোটি ১০ লাখ ডলার।

দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) জুলাই থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশে মোট ২ হাজার ৪৩৭ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৯৮২ কোটি মার্কিন ডলার। এ হিসাবে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২২ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১১ মার্চ দেশে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১৮ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার।

চলতি মাসের ১ থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশে মোট ১৯২ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১৩৩ কোটি মার্কিন ডলার। সে হিসাবে গত বছরের একই সময়ে ১১ মার্চ পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

টানা তিন মাস ধরে তিন বিলিয়ন করে রেমিট্যান্সের রেকর্ড হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি মাসের প্রথম ১৪ দিনে প্রবাসীরা ২২০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এর আগে কখনও দুই সপ্তাহে এত বেশি রেমিট্যান্স আসেনি। গত বছরের মার্চের একই সময়ে যা ছিল ১৬২ কোটি ডলার। এ হিসাবে চলতি মাসের দুই সপ্তাহে বেশি এসেছে ৫৮ কোটি ডলার বা ৩৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ঈদুল ফিতর এই বৃদ্ধির বড় কারণ।

আর গত ডিসেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার, যা ছিল দেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং চলতি অর্থবছরের কোনো এক মাসে আসা সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়। গত নভেম্বরে দেশে এসেছিল ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স।

এছাড়া গত অক্টোবর ও সেপ্টেম্বরে দেশে এসেছিল যথাক্রমে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার এবং ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। আর গত আগস্ট ও জুলাইয়ে যথাক্রমে দেশে এসেছিল ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার এবং ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স।

এদিকে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর জুড়ে দেশে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড।

বেলাবো উপজেলার বিনাবাইদ গ্রামের বাসিন্দা শফিকুল চৌধুরী সৌদি আরবের রিয়াদে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। নির্মাণ, পরিবহন, পর্যটন ও আবাসন খাতে তার ব্যবসা রয়েছে। তার এসব প্রতিষ্ঠানে ২১৭ জন বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন।

শফিকুল চৌধুরী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যদি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠানো সম্ভব হয়, তাহলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, তাই টিকে থাকতে হলে কর্মীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি নতুন নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও সম্প্রসারণে সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এতে করে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং প্রবাসী আয়ও বৃদ্ধি পাবে। তিনি আরও বলেন, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ও স্থিতিশীল হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান দৈনিক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সব কমার্শিয়াল ব্যাংককে নির্দেশনা দিয়েছে, তারা যেন রেমিট্যান্স সঠিক মাধ্যমে দেশে আনার বিষয়ে সর্বদা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয় এবং উদ্বুদ্ধ করে। আন্ডার ইনভয়েসিং দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কঠোর নজরদারি, ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতা বাড়ানোর ফলে এটি এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এটি সরকারের কার্যকর উদ্যোগের ফল এবং রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে রেমিট্যান্সে যে কারসাজি হতো, তা কমে গেছে। রেমিট্যান্সের এই ধারা অব্যাহত রাখতে সব ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।