ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

শিক্ষক নিয়োগকে ঘিরে উত্তাল ইবি, বিভাগীয় সভাপতিকে অপহরণের অভিযোগ

ইবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৮, ২০২৬, ০৬:১৩ পিএম
ট্যুরিজম বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম জুয়েল (বামে) ও ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ (ডানে)। ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে নিয়োগ বন্ধের দাবিতে বিভাগীয় সভাপতি সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম জুয়েলকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদের বিরুদ্ধে। যদিও নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে অভিযোগ অস্বীকার করে বিভাগীয় সভাপতিকে হাজির করেন ছাত্রদল আহ্বায়ক।

জানা যায়, এদিন সকাল ১০টায় ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ বোর্ড শুরু হওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি সকাল ১১টায় আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন শাপলা ফোরামের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে মানববন্ধন চলছিল। এরই মধ্যে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম জুয়েলকে অপহরণ করা হয়েছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ করা হয়, নিয়োগ বোর্ড থাকায় সকাল ৮টায় ঝিনাইদহে নিজ বাসভবন থেকে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে বের হলে তাকে একটি মোটরবাইকে তুলে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

অপহরণের অভিযোগ সামনে আসতেই শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। এর প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে থেকে একটি মিছিল বের করেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা, শাখা ছাত্রশিবির ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিবিএ অনুষদ প্রদক্ষিণ করে মেইন গেটে তালা দিয়ে বিক্ষোভ করে। পরে তারা প্রশাসন ভবন ঘেরাও করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

এ সময় তারা ‘নিয়োগ নিয়ে টালবাহানা চলবে না’, ‘চাঁদাবাজির রাজনীতি চলবে না’, ‘অপহরণের রাজনীতি চলবে না’, ‘নিয়োগ বাণিজ্যের রাজনীতি চলবে না’, ‘শিক্ষক কেন অপহরণ—প্রশাসন জবাব চাই’, ‘ক্ষমতা না জনতা, জনতা জনতা’, ‘কণ্ঠে আবার লাগা জোর, চাঁদাবাজদের কবর খোঁড়’, ‘আদু ভাই দেইখে যা, রাজপথে তোর বাপেরা’, ‘অপহরক অপহরক, আদু ভাই আদু ভাই’, ‘আদু ভাইয়ের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট একশন’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।

অপহরণের অভিযোগ প্রসঙ্গে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে অবস্থান জানান। তিনি বলেন, সকালে টিএইচএম বিভাগের সম্মানিত চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম জুয়েল নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন এবং আমাকে ফোন করেন। আমি নিজে গিয়ে তাকে নিয়ে আসি। সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম জুয়েল আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত ছোট ভাই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি আরও বলেন, তারা ব্যক্তিগতভাবে তাকে হুমকি দিয়েছে। গত সোমবার প্রক্টরের নির্দেশে ট্যুরিজম বিভাগে কয়েকজন লোক পাঠিয়ে দরজা বন্ধ করে চারজন শিক্ষককে জোরপূর্বক মারধরের হুমকি দিয়ে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়। চারজন শিক্ষককে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজ জোরপূর্বক ডিলিট করা হয়। গতকাল ও আজ প্রক্টর তাকে হুমকি দিচ্ছে। এ কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে জুয়েল আমার কাছে ছিল। বর্তমানে জুয়েল তার নিজ বাসা ঝিনাইদহে অবস্থান করছেন।

এই পোস্টের কিছুক্ষণ পর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ ফেসবুক লাইভে আসেন। এসময় তিনি বিভাগের সভাপতি শরিফুল ইসলাম জুয়েলকে উপস্থাপন করেন। লাইভে আরও উপস্থিত ছিলেন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও প্রক্টরের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম জনি, রয়েল হক, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের ড্রাইভার এবং সভাপতি জুয়েলের ছোট ভাই।

অপহরণ প্রসঙ্গে বিভাগের সভাপতি শরিফুল ইসলাম জুয়েল ফেসবুক লাইভে বলেন, ‘আমি বাসায় আছি এবং নিরাপদে আছি। নিরাপত্তাহীনতার কারণে সকাল ৯টায় সাহেদ ভাই আমাকে বাসায় পৌঁছে দেন। আমি কোনো ধরনের অপহরণের শিকার হইনি। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মীরাও উপস্থিত আছেন। গত পরশুদিন বিভাগে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। সেদিন থেকেই আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলাম। এখন আমি নিরাপদ।’

বিভাগীয় সভাপতির বক্তব্যের পর লাইভে আবারও ছাত্রদলের আহ্বায়ক বলেন, ‘আপনারা অনর্থক কোনো ব্লেম গেম খেলবেন না। গত পরশু বিশ্ববিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষককে জিম্মি করে হুমকি দিয়ে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমি ফেসবুক পোস্টে বিষয়টি স্পষ্ট করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরের নির্দেশেই এসব হয়েছে। চেয়ারম্যান আমার দীর্ঘদিনের কাছের ছোট ভাই। সকালে সে আমাকে ফোন করে জানায়, সে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। প্রক্টর ও রেজিস্ট্রার তাকে হুমকি দেয়—না গেলে চাকরি খেয়ে দেওয়া হবে, শোকজ করা হবে। প্রক্টর নিজে নির্দেশ দিয়ে এসব করিয়েছে।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি জানার পর আমরা দুইজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে তার বাড়িতে পাঠাই এবং তখন তিনি নিজ বাড়িতেই উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে তাকে ডিবি অফিসে নেওয়া হয়। সেখানে কিছু জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হবে। হুমকি দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত তিন দিনে তার সঙ্গে বিভাগের সভাপতি জুয়েলের কোনো যোগাযোগই হয়নি।

এদিকে বিভাগের সভাপতি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সুস্থভাবে না ফেরা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিভাগীয় সভাপতিকে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের গেটে তালা দিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষার্থীরা, শাখা ছাত্রশিবির ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিভাগের সভাপতি জুয়েল ডিবি অফিসেই অবস্থান করছেন।