ঘোষণা অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কমিশন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। তবে এই অর্থের প্রায় পুরোটা এখন অন্য খাতে ব্যয় করা হয়েছে। জানা গেছে, এর সিংহভাগই জ্বালানি খাতে ভর্তুকি হিসেবে চলে গেছে। এছাড়া কৃষিঋণ মওকুফ ও ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতেও এই অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। ফলে চলতি অর্থবছরে নতুন পে-কমিশন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা আলাদা করে রাখা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন, বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার বদলে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জেরে ইরানকে ঘিরে সৃষ্ট সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটেছে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারকে তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ এবং ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য নতুন বরাদ্দের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত ৪০ হাজার কোটি টাকা থেকে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে ২৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। কৃষিঋণ মওকুফে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র পরিবারের নারী সদস্যদের মাসিক আড়াই হাজার টাকা সহায়তা দিতে চালু হওয়া ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এসব ব্যয়ের ফলে বেতন কমিশনের জন্য সংরক্ষিত অর্থের প্রায় পুরোটা শেষ হয়ে গেছে। হিসাব অনুযায়ী, ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে এরই মধ্যে ৩৯ হাজার ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়েছে। অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৯৬১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন জাতীয় বেতন কমিশন বাস্তবায়ন করা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ এটি বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন, যা বর্তমান বাজেট কাঠামোর মধ্যে জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির জন্য যে প্রস্তুতি ছিল, তা বাস্তবায়নের মতো পরিস্থিতি এখন নেই। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ সরকারের আর্থিক পরিকল্পনায় বড় প্রভাব ফেলেছে।’
তিনি আরও জানান, চলতি অর্থবছরের মধ্যে এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের সম্ভাবনাও কম, কারণ বাজেটের বড় অংশ এরই মধ্যে জরুরি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

