ইস্তাম্বুলে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হতে পারে, শহরটা বুঝি মানুষের নয়—বিড়ালদের। ফুটপাতের কোণে, দোকানের দরজায়, ফেরির ডেকে কিংবা রেস্তোরাঁর চেয়ারে নির্বিঘ্ন ঘুমিয়ে থাকা একেকটি বিড়াল যেন নিঃশব্দে জানিয়ে দেয়—এ শহরে তারা অতিথি নয়, স্বত্বাধিকারী।
সাদা-ধূসর রঙের বিড়াল ক্যানিয়নের গল্পটা তেমনই। একটি শপিং সেন্টারে থাকা এই বিড়ালটির ঝুড়ি হারিয়ে যাওয়ার পর ইস্তাম্বুলবাসীর ভালোবাসায় সে হয়ে উঠেছে মোটা-তাজা, আরামে ভরা এক ‘রাজপুত্র’। কেউ দিয়েছে খাবার, কেউ খেলনা, কেউ বানিয়ে দিয়েছে আরামদায়ক ঘর। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যানিয়নের নামে খোলা হয়েছে আলাদা ইনস্টাগ্রাম পেজ। এখানে বিড়াল হারিয়ে গেলে মানুষ খোঁজে, মানুষ নয়।

ক্যানিয়ন অবশ্য ব্যতিক্রম নয়। সিটি করপোরেশনের হিসাব বলছে, ইস্তাম্বুলের রাস্তায় বাস করে প্রায় এক লাখ ষাট হাজারের বেশি বিড়াল। আর প্রায় এক কোটি ষাট লাখ মানুষ প্রতিদিন তাদের খাবার দেয়, আদর করে, পাশে বসে থাকে। এই ভালোবাসা নিছক শখ নয়—অনেকটা বিশ্বাসের মতো, ধর্মীয় অনুভূতির মতো গভীর।
ইস্তাম্বুলের ইউরোপীয় অংশ হোক কিংবা এশীয়—যেখানেই যান, বিড়াল চোখে পড়বেই। ফেরিতে শান্ত ভঙ্গিতে বসে থাকা, সুপারশপে ধীরে হাঁটা, দোকানের কাঁচের জানালায় গোল হয়ে ঘুমিয়ে পড়া—সব জায়গায় তাদের অবাধ উপস্থিতি। কেউ তাড়ায় না, কেউ বিরক্ত করে না। কারণ এ শহরে বিড়াল মানেই আপনজন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ইস্তাম্বুল প্রাণী ভালোবাসে। এখানে বিড়াল দামী কাপড়ের ওপর ঘুমিয়ে পড়লেও দোকানদার বিরক্ত হন না। বরং সেটাকেই স্বাভাবিক ধরে নেন। তাই ইস্তাম্বুলকে বলা হয় ‘বিড়ালের শহর’।

এই শহরে অনেক পথবিড়ালই আবার তারকা। ২০১৬ সালে কাদিকয় এলাকায় বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসে থাকা গোলগাল বিড়াল ‘টম্বিলি’-র সেই ছবি ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়। পরে তার স্মরণে তৈরি করা হয় ব্রোঞ্জের মূর্তি। আবার হাগিয়া সোফিয়ার বিখ্যাত বিড়াল ‘গ্লি’ মারা গেলে দেশজুড়ে শোকের খবর প্রকাশিত হয়। এমনকি ২০০৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও তাকে আদর করেছিলেন।
অটোমান সুলতানদের ঐতিহাসিক বাসভবন টোপকাপি প্রাসাদেও বিড়ালদের জন্য আলাদা দরজা আছে—যেগুলো শত শত বছর পর আবার চালু করা হয়েছে। প্রাসাদের পরিচালক বলেন, বিড়াল সবসময়ই এখানে ছিল। তারা পরিষ্কার, শান্ত এবং মানুষের কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই ভালোবাসার পেছনে ইসলামের ইতিহাসও বড় ভূমিকা রেখেছে। নবী মুহাম্মদের বিড়ালপ্রেমের গল্প ইস্তাম্বুলবাসীর মানসিকতায় গভীরভাবে প্রোথিত। ১৪৫৩ সালে অটোমানদের কনস্টান্টিনোপল দখলের সময় বাজারের সামনে বিড়ালদের খাবারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত। তখন বিড়ালকে খাবার দেওয়া হতো ঈশ্বরের নামে দান হিসেবে।

ছয় শতক পেরিয়ে গেলেও সেই সহাবস্থান অটুট। যদিও এখন শহর কর্তৃপক্ষ সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। নির্বীজকরণ চলছে, নিয়মও আসছে। তবু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। এখানে ইঁদুর নেই বললেই চলে। বিদেশি শিক্ষার্থীরা বলেন, এত বিড়ালের মাঝে ইঁদুর টিকে থাকার সাহসই পায় না।
ইস্তাম্বুলে মানুষ আর বিড়াল পাশাপাশি থাকে—কেউ কারও মালিক নয়, কেউ কারও অতিথিও নয়। এখানে ভালোবাসা নীরব, উপস্থিতি স্বাভাবিক, আর সহাবস্থানটা রাজকীয়।
এ শহরে তাই মানুষ থাকে মানুষের মতোই। আর বিড়াল থাকে—রাজার হালে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন