ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

কেন ক্যানসারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে জেন-জি

রূপালী স্বাস্থ
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

বছরের পর বছর ধরে ক্যানসারকে বয়স্কদের রোগ বলেই মনে করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারণা ভেঙে যাচ্ছে। জেনারেশন মিলেনিয়াল ও জেনারেশন জেড—অর্থাৎ ২০-এর শেষভাগ থেকে ৪০-এর শুরুর বয়সি মানুষের মধ্যে ক্যানসারের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন এর অন্যতম কারণ।

৪ ফেব্রুয়ারি পালিত বিশ্ব ক্যানসার দিবসে প্রকাশিত নানা গবেষণা বলছে—ক্যানসার আর শুধু বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে, বিশেষ করে জেনারেশন জেড ও জেনারেশন মিলেনিয়ালদের মধ্যে, ক্যানসার শনাক্তের হার বাড়ছে।

একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যানসারের ঘটনা ৭৯ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ক্যানসারে মৃত্যুহারও বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ।

২০২৪ সালে দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০ সালের পর জন্মগ্রহণকারী নারী ও পুরুষদের মধ্যে অন্তত ১৭ ধরনের ক্যানসারের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্রান্ত্র ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি।

গবেষণার সহলেখক ও আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির মহামারিবিদ হিউনা সুং জানান, ১৯৮০-এর দশকের পর জন্মগ্রহণকারীদের মধ্যে মলদ্বার ক্যানসারের ঝুঁকি ১৯৫০-এর দশকে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় চার গুণ বেশি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রাথমিক ক্যানসারের ঘটনা আরও ৩১ শতাংশ বাড়তে পারে।

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি নয় জন নাগরিকের মধ্যে একজনের জীবদ্দশায় ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অ্যাপোলো হাসপাতালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশের তুলনায় ভারতে তুলনামূলক কম বয়সেই ক্যানসার ধরা পড়ছে।

চিকিৎসকদের মতে, এর পেছনে কোনো একক কারণ নেই। বরং একাধিক জীবনধারা ও পরিবেশগত উপাদান একসঙ্গে কাজ করছে।

ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো খাদ্যাভ্যাস। আল্ট্রা-প্রসেসড খাবারসমৃদ্ধ ডায়েট ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়—এমন প্রমাণ মিলেছে বহু গবেষণায়। শরীরের ওজন স্বাভাবিক হলেও এই ধরনের খাবার ক্যানসারের আশঙ্কা বাড়াতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে যাদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) বেশি ছিল, প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তাদের কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এ ছাড়াও ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ হলো ঘুমের অভাব ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ। মিলেনিয়াল জেনারেশন ও জেনারেশন জেড আগের প্রজন্মের তুলনায় কম ঘুমান। রাত জেগে মোবাইল ও অন্যান্য স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ ব্যাহত হয়, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

দীর্ঘদিনের সার্কাডিয়ান রিদমের ব্যাঘাত স্তন, কোলোরেক্টাল, ফুসফুস ও লিভার ক্যানসারের সঙ্গে যুক্ত বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরে প্রদাহ বাড়ায় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে।

অ্যালকোহল দীর্ঘদিন ধরেই একটি পরিচিত কার্সিনোজেন। অতিরিক্ত মদ্যপান স্তন, মুখ ও গলার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। কিছু গবেষণায় বিয়ারে থাকা পারফ্লুরোঅ্যালকাইল পদার্থ (পিএফএএস) টেস্টিকুলার ও কিডনি ক্যানসারের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সেবনের ফলে সন্তানদের প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বমি বমি ভাব কমানোর ওষুধ এবং কিছু হরমোনাল চিকিৎসার সঙ্গে এই ঝুঁকির সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা।

মাইক্রোপ্লাস্টিক ও তথাকথিত ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ আমাদের বাতাস, পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করছে। যদিও প্রমাণ এখনো সীমিত, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।